ট্রাম্পের আহ্বান উপেক্ষা করে রুশ তেল শোধনাগারে হামলার ঘোষণা জেলেনস্কির
- 0


প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫ ২০২৬, ১৭:২৯
রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে আবারও হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানে হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার পর রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে—এমন অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান জানান তিনি। এরই মধ্যে রাশিয়ার রায়াজান অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। এপি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুশ কর্তৃপক্ষ ও ইউক্রেনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ওই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সাক্ষাৎকারে রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আর কত দিন বহাল থাকবে—এমন প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি বলেন, “ব্যস, আর নয়। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলো।” তবে হামলা ঠিক কবে থেকে পুরোদমে শুরু হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
জেলেনস্কির এই ঘোষণা এমন সময়ে এলো, যখন রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ চুক্তি, ইউক্রেনের ওপর সামরিক চাপ এবং গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি নিয়ে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
ডিজেল চুক্তি ঘিরে বিরোধ
গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে তাঁর সমঝোতা হয়েছে। এরপর রুশ জ্বালানি থেকে মস্কোর আয় কমানোর উদ্দেশ্যে আরোপ করা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করে তাঁর প্রশাসন। ট্রাম্পের যুক্তি, জ্বালানির সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানোর প্রয়োজন রয়েছে।
কিন্তু কিয়েভের মতে, এই চুক্তি রাশিয়াকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য বাড়তি অর্থ জোগানোর সুযোগ দিতে পারে। জেলেনস্কি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং মস্কোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সমঝোতা করার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, পুতিন “প্রকৃত মন্দ”। এমন একজন নেতার সঙ্গে ট্রাম্প কীভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ট্রাম্প গত রোববার একতরফাভাবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বলে ঘোষণা করেছিলেন। এরপর ইউক্রেন রুশ তেল শোধনাগারে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। কিন্তু কিয়েভের অভিযোগ, ইউক্রেন বিরতি মেনে চললেও রাশিয়া তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে গেছে।
বুধবার রাতের রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিয়েভে প্রায় ৬০০,০০০ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউক্রেনের দাবি, এই পরিস্থিতিতে হামলা বন্ধ রাখার একতরফা চাপ মেনে চলার আর কোনো কারণ নেই।
গোয়েন্দা সহযোগিতা ও স্টারলিংক নিয়ে উদ্বেগ
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধের আরেকটি বড় কারণ আমেরিকার গোয়েন্দা সহযোগিতা। জেলেনস্কির অভিযোগ, রুশ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ না করলে ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন আমেরিকান সামরিক কর্মকর্তারা। সাম্প্রতিক রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তাও ইউক্রেন পায়নি বলে জানান তিনি।
তবে আমেরিকান কর্মকর্তারা এই সপ্তাহে বলেছেন, ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি কমানো হয়নি। এ ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করার হুমকি দেওয়ার কথাও তাঁরা অস্বীকার করেছেন। ফলে গোয়েন্দা সহযোগিতা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
এদিকে, ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সামরিক সংস্করণ স্টারশিল্ড ব্যবহারেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। ইউক্রেনের অভিযোগ, চলমান অবস্থায় দ্রুতগতিতে থাকা ডিভাইসের যোগাযোগ সীমিত হওয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সামরিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর-অর্থায়িত এই ব্যবস্থাটি ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চলমান ডিভাইসে স্টারশিল্ডের সংযোগ পুরোপুরি ফিরেছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। তবে ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের দূতাবাস জানিয়েছে, সেবা আবার চালু হয়েছে।
ইউরোপের সমর্থন, তবে মতভেদও রয়েছে
বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে জেলেনস্কির বক্তব্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব আরও প্রকাশ্যে আসে। ইউরোপের কয়েকজন নেতা রুশ তেল শোধনাগারে হামলায় ফেরার সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টেন মিচাল বলেন, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হলে যুদ্ধের অর্থায়নও কঠিন হবে।
নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব ইয়েটেনও ট্রাম্পের ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, চুক্তিটি বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে না, বরং পুতিনের যুদ্ধের তহবিলে অর্থ যোগ করবে। তবে বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ বলেন, তিনি কোনো তেল শোধনাগারে হামলাকেই সমর্থন করেন না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস বলেন, আগ্রাসন বন্ধ করতে আক্রমণকারীকে চাপ দেওয়া উচিত, আক্রান্ত দেশকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা নয়। ইউক্রেনকে চাপের মধ্যে ফেলার নীতি সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সামনে আরও গভীর হতে পারে দূরত্ব
রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি, হামলা বন্ধের আহ্বান এবং সামরিক সহযোগিতা নিয়ে বিরোধ ইউক্রেন ও আমেরিকার সম্পর্ককে নতুন অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিচালনায় আমেরিকার গোয়েন্দা সহায়তা ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এসব বিষয়ে যেকোনো সীমাবদ্ধতা কিয়েভের সামরিক সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের প্রশাসন জ্বালানির দাম কমানোর যুক্তি সামনে রেখে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে এবং ইউক্রেনের হামলা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এখন জেলেনস্কি আবারও রুশ তেল শোধনাগারে হামলার ঘোষণা দেওয়ায় সেই অবস্থানের সঙ্গে কিয়েভের মতবিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়েছে।
