দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তর কোরিয়া সফর করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আজ সোমবার সকালে দেশটির রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে পৌঁছান জিনপিং। এ সময় তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়ে স্বাগত জানান উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন।
২০১৯ সালের পর বেইজিংয়ের নেতার পিয়ংইয়ংয়ে এটি প্রথম সফর। এ ছাড়াও ২০২২ সালের পর উল্লেখযোগ্যভাবে রাষ্ট্রীয় সফর কমিয়ে আনেন জিনপিং। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কিংবা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো শক্তিশালী নেতারাও নিজেরা চীন আসেন জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়ার জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং মনে করেন, সফর বিমুখ জিনপিংয়ের এ সময়ে উত্তর কোরিয়া গমন নিছক কোনো ঘটনা নয়। বরং বিভিন্ন কারণে উত্তর কোরিয়া এখন তার কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে ইয়াং বলেন, ‘আমাদের মাথায় রাখতে হবে জিনপিং সচারচর বিদেশ সফরে যান না। এখন এটাই ট্রেন্ড যে, আন্তর্জাতিক নেতারা তার সঙ্গে সাক্ষাতে বেইজিং আসবেন।’
‘জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফরের সিদ্ধান্ত নেওয়া দেখায় যে, তার কাছে উত্তর কোরিয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।‘
এদিকে পিয়ংইয়ং পৌঁছানোর আগে প্রকাশিত এক সংবাদপত্রে জিনপিং বলেন, ‘একটি নতুন ঐতিহাসিক সূচনাবিন্দুতে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক।‘
উত্তর কোরিয়ার উপর পুনঃপ্রভাবের প্রচেষ্টা
দীর্ঘ সময় ধরে উত্তর কোরিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল চীন। দেশটির আমদানি ও রপ্তানির ৯৫ ভাগ পূরণ হতো চীনের মাধ্যমে। তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর নাটকীয়ভাবে এর পরিবর্তন ঘটে। ওই সময় থেকে রাশিয়ায় অস্ত্র, গোলাবারুদ, সৈন্য সহযোগিতা দিয়ে আসছে উত্তর কোরিয়া। যা দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করছে। একইসঙ্গে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
বেইজিং মনে করছে, এর মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়ার ওপর রাশিয়া প্রভাব বিস্তার করছে, যা চীনের জন্য ইতিবাচক নয়। বরং উত্তর কোরিয়ার উপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চান জিনপিং।
স্টিমসন সেন্টারের কোরিয়া প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো র্যাচেল মিনইয়ং লি মনে করেন, ‘রাশিয়ার প্রভাব এড়াতে এবং নিজেদের অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে উত্তর কোরিয়াকে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিতে যাচ্ছেন জিনপিং।‘
এদিকে ইয়াং বলছেন, যদিও চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি আছে, তবুও দেশটিকে সামরিক সহায়তা দিতে বরাবরই সতর্কতা অবলম্বন করেছে বেইজিং।
বেইজিং মনে করে, রাশিয়ার সহযোগিতায় সামরিকভাবে পিয়ংইয়ং আরও শক্তিশালী হলে, তা পুরো কোরীয় উপদ্বীপ অঞ্চলের জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
কোরীয় উপদ্বীপের উত্তেজনা নিরসন
উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া কার্যত ১৯৫০ সাল থেকে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ২০২৪ সালে কিম জং উন কোরিয়া একন্দ্রীকরণের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পরিত্যাগের ঘোষণা করলেও, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এরপর থেকে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দেন।
দুই দেশের মধ্যকার যোগাযোগ স্বাভাবিক করতে বেইজিংয়ের কাছে সহায়তা চেয়েছে সিউল।
অন্যদিকে ঐতিহাসিকভাবে চীনের বিরোধ জাপানের সঙ্গে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাপানকে সামরিক সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসায়- এ নিয়েও চিন্তিত জিনপিং।
সব মিলিয়ে কোরীয় উপদ্বীপের উত্তেজনা নিরসন ও নিজেদের স্বার্থ রক্ষা এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।