মধ্যবর্তী নির্বাচন
কংগ্রেসকে ছাড়াই দেশ চালাতে আগাম পরিকল্পনা হোয়াইট হাউসের
- 0


প্রকাশিত: নভেম্বর ১ ২০২৬, ১৬:১৮ হালনাগাদ: নভেম্বর ১ ২০২৬, ১৭:১৪
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে কীভাবে নিজস্ব কর্মসূচি চালিয়ে যাবে, তার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস। কংগ্রেসের নতুন অনুমোদন ছাড়াই অভিবাসন, শুল্ক, আবাসন ব্যয় ও সরকারি অর্থ বরাদ্দের মতো বিষয়ে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথ খুঁজছেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য তদন্ত মোকাবিলার প্রস্তুতিও চলছে। রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা এবং পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত আরও দুই ব্যক্তির বরাতে এ তথ্য উঠে এসেছে। আগামী মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে এই প্রস্তুতি প্রকাশ্যে এলো।
বাস্তবতা হলো, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেও প্রেসিডেন্টের হাতে বাণিজ্যনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং ফেডারেল প্রশাসন পরিচালনার বিস্তৃত নির্বাহী ক্ষমতা থেকে যায়। সেই ক্ষমতাই ব্যবহার করে নিজের কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চান ট্রাম্প।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল থেকেই হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার, বাজেট ডিরেক্টর রাসেল ভট এবং হোয়াইট হাউস কাউন্সেল অফিসের কর্মকর্তারা এ নিয়ে কাজ করছেন। হোয়াইট হাউসের আইনবিষয়ক প্রধান উইল শার্ফ ও তাঁর দল খতিয়ে দেখছেন, প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই আইনত কী করতে পারেন, কোথায় তাঁর ক্ষমতার সীমা পরীক্ষা করা সম্ভব এবং আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে কীভাবে সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেওয়া যাবে।
এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন আমদানিতে নতুন শুল্ক আরোপ, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী বিদেশি কর্মীদের ভিসার নিয়ম কঠোর করা এবং আবাসন ও নির্মাণ ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ। বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থাও কংগ্রেসের নতুন অনুমোদন ছাড়াই বাস্তবায়ন করা সম্ভব—এমন প্রস্তাব ও আইনি পর্যালোচনা জমা দিয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনের ফল যাই হোক, প্রশাসনের নীতিগত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প পথ তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে হোয়াইট হাউস।
ফেডারেল বাজেটকে কিভাবে কাজে লাগাবে প্রশাসন
সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রস্তুতি চলছে। ফেডারেল বাজেটের দায়িত্বে থাকা রাসেল ভট এমন কর্মসূচি চিহ্নিত করছেন, যেগুলো কংগ্রেস আগে থেকেই যে অর্থ অনুমোদন করেছে, তা ব্যবহার করে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে সরকারি অনুদান বণ্টনের নিয়ম পরিবর্তন করে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। এতে নতুন করে কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়েই কোন সরকারি কর্মসূচি অর্থ পাবে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউসের প্রভাব বাড়তে পারে। ট্রাম্পকে এসব পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে এবং আলোচনায় তিনিও অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে সূত্র।
কংগ্রেসের ক্ষমতা এড়ানো সম্ভব নয় প্রেসিডেন্টের জন্য
তবে কংগ্রেসের ক্ষমতা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অ্যামেরিকার সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়ন, সরকারি অর্থ বরাদ্দ এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কংগ্রেসের। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দিতে পারবেন। বিশেষ করে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ট্রাম্পের মনোনয়ন অনুমোদন আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও পাবেন তাঁরা; এমনকি সুপ্রিম কোর্টের কোনো শূন্য পদে মনোনয়নও বাধার মুখে পড়তে পারে।
এই ক্ষমতা অর্জনের জন্য ডেমোক্র্যাটদের দুই কক্ষেই অন্তত চারটি করে আসন বাড়াতে হবে। বর্তমানে হাউযে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ২১৮-২১৪ এবং সেনেটে ৫৩ আসন নিয়ে এগিয়ে রিপাবলিকানরা। যেখানে ডেমোক্র্যাটদের আসন ৪৭। জনমত জরিপে হাউযে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও সেনেটের লড়াই এখনো অনিশ্চিত।
নিয়ন্ত্রণ পেলেও ডেমোক্র্যাটরা কি ট্রাম্পকে আটকাতে পারবেন?
তবে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্পের সব সিদ্ধান্ত বন্ধ করতে পারবেন না। তাঁরা তাঁর প্রস্তাবিত আইন আটকে দিতে পারেন, কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের পাস করা কোনো বিলে প্রেসিডেন্ট ভেটো দিতে পারবেন। সেই ভেটো অতিক্রম করতে হাউয ও সেনেট—দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। আবার ট্রাম্প জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে নতুন আইন ছাড়াই কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারেন। কংগ্রেস এমন জরুরি অবস্থা বাতিলের উদ্যোগ নিলেও প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে তা অতিক্রম করা কঠিন হবে। তবে নির্বাহী ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করলে আদালত তাঁর সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারে।
ট্রাম্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ কি?
ট্রাম্পের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য তদন্ত। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে তাঁরা শুনানি, সাবপোনা এবং সরকারি নথি তলবের মাধ্যমে তদন্ত করতে পারেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের, তাঁর রাজনৈতিক মিত্র কিংবা অনুদানদাতাদের কোনো সুবিধা দিয়েছেন কি না। এই সম্ভাবনা মাথায় রেখে হোয়াইট হাউসের আইনজীবীরা রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা ও বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থার প্রধানদের কংগ্রেসের প্রশ্ন, নথি চাওয়া এবং আইনি তলব আদেশের জবাব দেওয়ার বিষয়ে ব্রিফ করছেন। লিখিত যোগাযোগের ক্ষেত্রেও কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের সূত্র আরও জানিয়েছে, ব্যক্তিগত উপদেষ্টাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ কংগ্রেসের তদন্তের বাইরে রাখতে নির্বাহী গোপনীয়তার অধিকার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, সে বিষয়ে জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের আইনি মতামতও চেয়েছে হোয়াইট হাউস। তবে এমন দাবি আদালতে কতটা টিকবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র লরেন বিস বলেছেন, প্রশাসন সীমান্ত সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অ্যামেরিকানদের আয় বাড়ানোর কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। তাঁর অভিযোগ, সংবাদমাধ্যম রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য পরাজয় নিয়ে ভুল বয়ান তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে, ৩ নভেম্বরের নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না; পরবর্তী দুই বছরে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে দিতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা জিতলে তদন্ত, সরকারি ব্যয়, আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক নিয়োগে ট্রাম্পের সামনে বাধা বাড়বে। কিন্তু প্রেসিডেন্টও নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমে নিজের কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। ফলে নির্বাচনের পর কংগ্রেস, হোয়াইট হাউস ও আদালতের মধ্যে ক্ষমতার সীমা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
