ওপেক এবং ওপেক প্লাস জোট ছাড়ার ঘোষণা আরব আমিরাতের
- 0


প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮ ২০২৬, ১৪:৪৩
ইরান যুদ্ধের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে নতুন ধাক্কা দিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। মঙ্গলবার দেশটি ঘোষণা দিয়েছে, তারা তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক এবং ওপেক প্লাস ছাড়ছে। দীর্ঘদিনের সদস্য আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওপেকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে তেল উৎপাদন ও সরবরাহ নীতিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে নতুন সিদ্ধান্তে জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্য দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ওপেক বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে অন্যতম শক্তিশালী সংগঠন, কারণ এই সংস্থাটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি উৎপাদন করে।
আমিরাত বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণার পর ওপেকের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১১। এগুলো হলো— সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, ভেনেজুয়েলা, আলজেরিয়া, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, গ্যাবন, ইকুইটোরিয়াল গিনি এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্র। আর ওপেকের সব সদস্যই ওপেক প্লাসের সদস্য।
আমিরাতের জ্বালানিমন্ত্রী সুহাইল মোহাম্মদ আল মাজরুই জানান, দেশটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি কৌশল বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটি পুরোপুরি নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং উৎপাদন মাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নেওয়া হয়েছে।
মাজরুই আরও জানান, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সৌদি আরবসহ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। অর্থাৎ এটি এককভাবে আমিরাতের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন আগেই ব্যাহত হচ্ছিল। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে সরবরাহ হয়। ইরানের হুমকি ও জাহাজে হামলার কারণে ওপেকভুক্ত উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের রপ্তানি ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারছিল না।
এই পরিস্থিতিতে মাজরুই দাবি করেন, আমিরাতের ওপেক ছাড়ার ফলে বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না, কারণ প্রণালী ঘিরে বর্তমান সংকটই এখন মূল নির্ধারক।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ওপেকের ঐক্য ও কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। উৎপাদন কোটা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে জোটের সমন্বিত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্ত অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ওপেককে তেলের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর অভিযোগ করে আসছেন। তিনি আরও বলেছেন, অ্যামেরিকা যখন উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তখন তারা উচ্চমূল্যের মাধ্যমে বিশ্বকে চাপের মুখে ফেলে।
এই প্রেক্ষাপটে আমিরাতের সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া যুদ্ধ চলাকালে ইরানের একাধিক হামলার মুখে পড়ার পর আমিরাত আরব দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো লজিস্টিক সহায়তা দিলেও রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে তাদের অবস্থান “ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল” ছিল।
তিনি আরও বলেন, আরব লিগের দুর্বল প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত হলেও গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের অবস্থান তাকে বিস্মিত করেছে।
আমিরাতের ওপেক ত্যাগ শুধু জ্বালানি বাজার নয়, মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান যুদ্ধ, হরমুজ সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত ওপেকের ভবিষ্যৎ ভূমিকা ও প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
