ডাবল সেঞ্চুরির পর ব্যাটের মাথায় হেলমেট উঁচিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে ছুটেন হৃদয়, সিলেট, ৭ নভেম্বর। ছবি: বিসিবি
0
মিরপুরে আগের টেস্টের দুই ইনিংসেই অসময়ে শট খেলতে গিয়ে আউট হওয়ার বিষাদ নিশ্চয়ই তাঁকে তাড়া করেছিল। কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্যই তো এখানেই। কাল যে ভুলের জন্য মাথা নিচু করতে হয়, আজ সেই ক্রিকেটই ঘুরে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করার সুযোগ করে দেয়। হৃদয় সেটাই করেছেন—শুধু করেছেন বললে কম বলা হয়। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে খেলেছেন এমন এক ইনিংস, যা নিয়ে বহু বছর আলোচনা হবে।
কিছু কিছু দৃশ্য সোনালি ইতিহাসের জ্বলজ্বলে সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকে সারাজীবন। সিলেট টেস্টে তাওহিদ হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরির পরের দৃশ্যটা ঠিক তেমনই। ব্যাটের আগায় হেলমেট রেখে ড্রেসিংরুমের দিকে ছুটে যাওয়ার সেই উল্লাসে যেন বহুদিনের জমে থাকা কোনো ঋণ শোধ করলেন এই তরুণ ব্যাটার।
মিরপুরে আগের টেস্টের দুই ইনিংসেই অসময়ে শট খেলতে গিয়ে আউট হওয়ার বিষাদ নিশ্চয়ই তাঁকে তাড়া করেছিল। কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্যই তো এখানেই। কাল যে ভুলের জন্য মাথা নিচু করতে হয়, আজ সেই ক্রিকেটই ঘুরে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করার সুযোগ করে দেয়। হৃদয় সেটাই করেছেন—শুধু করেছেন বললে কম বলা হয়। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে খেলেছেন এমন এক ইনিংস, যা নিয়ে বহু বছর আলোচনা হবে।
বিপর্যয় থেকে লিডের গল্প সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের করা ৩৫৬ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই মাত্র ২২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল বাংলাদেশ। দলের অবস্থা তখন অনেকটা ডুবন্ত নৌকার মতো। কিন্তু সেখান থেকে হাল ছাড়েননি তাওহিদ হৃদয়। প্রথম দিন ২৯ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়ার পর ধীরে ধীরে পাল্টে গেছে তাঁর ব্যাটিংয়ের গতিপ্রকৃতি।
কখনো রক্ষণে অবিচল, আবার কখনো আক্রমণে দুরন্ত। প্রথম ৫০ রান করতে ১০৯ বল খেললেও, পরবর্তী সময়ে তার ব্যাট আরও চওড়া হয়েছে। ৩৫৯ বলে ২৪২ রানের অপরাজিত এক ঐতিহাসিক ইনিংসে খেলে মাঠ ছাড়নে হৃদয়। তার এই দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ করে ৩৮৬ রান।
এই ইনিংসকে শুধু রান আর বলের হিসাবে মাপা যাবে না। এর সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি লুকিয়ে আছে শেষ দুই ব্যাটসম্যানকে নিয়ে গড়া জুটিতে। এক প্রান্তে একের পর এক সতীর্থ বিদায় নিলেও খেই হারাননি হৃদয়। তাসকিন আহমেদ কিংবা তাইজুল ইসলামকে কাছে ডেকে সাহস যুগিয়েছেন, বল ঠেকিয়ে স্ট্রাইক ধরে রেখেছেন। শেষ দুই ব্যাটসম্যানকে সঙ্গে নিয়ে যোগ করেছেন মহামূল্যবান ১৭২ রান।
সিলেট টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরির পর তাওহিদ হৃদয়ের উদযাপন
নিজের মাত্র ষষ্ঠ টেস্ট ইনিংসে খেলতে নেমে মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের পর চতুর্থ বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরির অভিজাত ক্লাবে নাম লেখালেন হৃদয়। তবে বিশেষ এই অর্জনের ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম বাংলাদেশি, যিনি নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই রূপ দিলেন ডাবল সেঞ্চুরিতে।
ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি হৃদয় দলের জন্য রেখে গেছেন এক অনন্য মানদণ্ড। বিপর্যয় থেকে কীভাবে দলকে টেনে তুলতে হয়, নিজের মাইলফলকের চেয়ে দলের প্রয়োজনকে কীভাবে বড় করে দেখতে হয়—তার এক দারুণ পাঠ দিয়ে গেলেন তিনি।
সিলেট টেস্টের ভাগ্য নির্ধারণে আরো দুদিন বাকি থাকলেও, হৃদয়ের এই মহাকাব্যিক ইনিংস ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখন সতীর্থদের দায়িত্ব, এই অর্জনের রং আরও গাঢ় করে জয় দিয়ে ম্যাচটি রাঙিয়ে তোলা।
প্রায়শ্চিত্তেরও বোধ হয় নিজস্ব একটা সৌন্দর্য আছে। সেখানে অনুশোচনা থাকে, থাকে নিজেকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। কখনো কখনো থাকে এমন এক উদ্যাপন, যা দেখে মনে হয়, এতক্ষণে বুঝি নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়াটা হয়ে গেল! সিলেটে সেটাই করে দেখালেন বাংলাদেশের এই তরুণ ব্যাটার।