হরমুজে আবারও অ্যামেরিকার নৌ অবরোধ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধের হুমকি ইরানের
- 0


প্রকাশিত: জুলাই ১৫ ২০২৬, ১৪:৫৭
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়েছে অ্যামেরিকা ও ইরান। ইরানের বিরুদ্ধে আবারও নৌ অবরোধ কার্যকর করেছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে অ্যামেরিকান বাহিনী। ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, অবরোধ অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হবে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং অঞ্চলটি আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার অ্যামেরিকার হামলায় অন্তত সাতজন সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে চালানো হামলায় ২৬০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অ্যামেরিকার হামলায় এটিই সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা।
অ্যামেরিকান সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, বুধবার রাতে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় একযোগে হামলা চালানো হয়। পরে দিনের আলোতেও নতুন করে হামলা অব্যাহত রাখা হয়, যা সাম্প্রতিক সংঘাতে খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন এখন আরও আক্রমণাত্মক সামরিক কৌশল গ্রহণ করেছে।
হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল গ্রেটার টুনব দ্বীপ, যা হরমুজ প্রণালির কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান। সেন্টকমের দাবি, সেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশে ইরানের ৩৮৮তম মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের ব্যারাকেও অন্তত ১৩টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে বাধ্যতামূলক সামরিক সদস্য এবং পেশাদার সেনাও রয়েছেন।
এই হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের বিরুদ্ধে আবারও নৌ অবরোধ কার্যকর করে অ্যামেরিকা। সেন্টকম জানিয়েছে, অবরোধ কার্যকরের মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যে ইরানি বন্দরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা দুটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে অ্যামেরিকান বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। গত ফেব্রুয়ারিতে অ্যামেরিকা ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর তেহরান কার্যত এই জলপথে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং আলোচনার টেবিলে ইরানের দরকষাকষির সক্ষমতাও বাড়ে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গত মাসে অ্যামেরিকা ও ইরান একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতায় পৌঁছায়। সেই চুক্তির অংশ হিসেবে অ্যামেরিকা প্রথম দফায় আরোপ করা নৌ অবরোধ তুলে নেয় এবং দুই পক্ষ ৬০ দিনের আলোচনায় বসতে সম্মত হয়। আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সংঘাত বাড়তে থাকায় সেই আলোচনা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সর্বশেষ নৌ অবরোধ পুনর্বহালের মধ্য দিয়ে সমঝোতার ভবিষ্যৎও এখন অনিশ্চিত।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, "মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয় সবার জন্য হবে, নতুবা কারও জন্যই হবে না।" বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, পুরো অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে দেওয়া একটি কৌশলগত সতর্কবার্তা।
সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার ভোরে বাহরাইন ও কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হয়। জর্ডান জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। ইরান দাবি করেছে, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে থাকা অ্যামেরিকান সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেছেন, ইরান সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে থাকা অ্যামেরিকান বাহিনীকে লক্ষ্য করে ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল এবং মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই অ্যামেরিকা সামরিক অভিযান জোরদার করেছে।
তবে সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদিনের পাল্টাপাল্টি হামলা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ছোট কোনো ভুল হিসাবও পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি যদি আরও দীর্ঘ সময় অচল থাকে, তাহলে শুধু অঞ্চল নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং বিশ্ব অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
