জ্বালানির দাম কমায় জুনে অ্যামেরিকায় মূল্যস্ফীতি কমেছে, তবে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
- 0


প্রকাশিত: জুলাই ১৪ ২০২৬, ১৬:০৭
অবশেষে কিছুটা স্বস্তির খবর পেলেন অ্যামেরিকার ভোক্তারা। কয়েক মাস ধরে যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপের পর জুনে দেশটির মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়েও বেশ খানিকটাই কমেছে। মূল কারণ—জ্বালানীর দামে বড় ধরনের পতন। তবে এই স্বস্তি কতদিন থাকবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, অ্যামেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ায় আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার।
মঙ্গলবার প্রকাশিত লেইবার ডিপার্টমেন্টের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১২ মাসের হিসাবে জুন মাসে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই বেড়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। মে মাসে এই হার ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ, যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। অন্যদিকে মাসভিত্তিক হিসাবে জুনে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে, যা ২০২০ সালের এপ্রিলের পর সবচেয়ে বড় মাসিক পতন।
এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে জ্বালানির দাম। জুনে গ্যাসের দাম প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়। মূলত জুনের মাঝামাঝি অ্যামেরিকা ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরেছিল। তার প্রভাব সরাসরি পড়ে জ্বালানি খাতে, আর সেখান থেকেই মূল্যস্ফীতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জুনের এই পরিসংখ্যান বর্তমান বাস্তবতাকে পুরোপুরি তুলে ধরে না। কারণ মাসের শেষ দিকে অ্যামেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে সামনের মাসগুলোতে ভোক্তাদের ওপর নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু পেট্রোল নয়, জুনে সামগ্রিক জ্বালানি খাতেও বড় ধরনের মূল্যহ্রাস দেখা গেছে। এক মাসে জ্বালানির দাম কমেছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২০ সালের এপ্রিলের পর সবচেয়ে বড় পতন। বিদ্যুতের দাম কমেছে ১ শতাংশ। পাশাপাশি গাড়ির বীমা, ব্যবহৃত গাড়ি, পোশাক এবং যোগাযোগসেবার খরচও কমেছে। চিকিৎসাসেবার ব্যয়ও সামান্য হ্রাস পেয়েছে। নতুন গাড়ির দাম টানা দুই মাস কমার পর জুনে স্থিতিশীল ছিল।
তবে সব খাতে স্বস্তি আসেনি। খাদ্যপণ্যের মধ্যে ডিমের দাম এক মাসে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সবচেয়ে বড় মাসিক বৃদ্ধি।
মূল্যস্ফীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক কোর ইনফ্লেশন, যেখানে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির খাত বাদ দেওয়া হয়, সেখানেও কিছুটা উন্নতির দেখা মিলেছে। জুনে কোর মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশে, যা মে মাসে ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। মাসভিত্তিক হিসাবে খাদ্য ও জ্বালানী বহির্ভূত মূল্যস্ফীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এতে ফেডারেল রিজার্ভের ওপর তাৎক্ষণিক সুদের হার বাড়ানোর চাপ কিছুটা কমেছে। যদিও ফেডের নীতিনির্ধারকদের একাংশ এখনও মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সতর্ক অবস্থান বজায় রাখতে হবে।
ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ কংগ্রেসে বক্তব্য দেওয়ার আগে জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে ফেড গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালার সতর্ক করে বলেন, যদি মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে শুরু করে, তাহলে খুব শিগগিরই সুদের হার বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এডওয়ার্ড জোন্সের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ অ্যাঞ্জেলো কোরকাফাস মনে করেন, জুনের মূল্যস্ফীতির তথ্য ঠিক সময়েই কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। তার ভাষায়, বসন্তে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলেও সেটি অর্থনীতির অন্যান্য খাতে ব্যাপক মূল্যচাপ তৈরি করতে পারেনি। এতে ফেডের হাতে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার কিছুটা সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা—এই স্বস্তি সাময়িকও হতে পারে। নতুন শুল্ক আরোপ, জ্বালানির দামে নতুন উল্লম্ফন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের সংঘাত—যেকোনো একটি কারণই আবার মূল্যস্ফীতিকে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলতে পারে।
এরই মধ্যে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে। ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে আবারও অবরোধ কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আবারও ব্যাহত হতে পারে, যার প্রভাব শুধু অ্যামেরিকাতেই নয়, বিশ্বের প্রায় সব অর্থনীতিতেই পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
