হোয়াইট হাউসে বড় রদবদল
সুজি ওয়াইলসের স্থলে স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ নিয়োগ
- 0


প্রকাশিত: নভেম্বর ৬ ২০২৬, ২১:৪৮
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পর এবার হোয়াইট হাউসে বড় রদবদল করলেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং কঠোর অভিবাসননীতির অন্যতম প্রধান কারিগর স্টিফেন মিলারকে নতুন হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে দায়িত্ব পালন করা সুজি ওয়াইলস। আগামী সোমবার, ৯ নভেম্বর থেকে দায়িত্ব নেবেন মিলার। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া হাউয ও সেনেটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনের নীতিতে সমঝোতার বদলে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন—মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের অসন্তোষের বার্তা পাওয়ার পরও ট্রাম্প কেন তাঁর সবচেয়ে কঠোর নীতির কারিগরকে আরও ক্ষমতাবান অবস্থানে বসালেন? এই নিয়োগ কি শুধু আস্থার পুরস্কার, নাকি কংগ্রেসের সঙ্গে আসন্ন সংঘাতের প্রস্তুতি?
স্টিফেন মিলার ট্রাম্পের রাজনৈতিক বলয়ের নতুন কেউ নন। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় স্পিচ রাইটার হিসেবে যোগ দেন তিনি। এরপর প্রথম মেয়াদে এবং ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পরও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রভাব বিস্তার করেন। এতদিন তিনি ছিলেন ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ফর পলিসি। অভিবাসননীতি ছাড়াও প্রশাসনের বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ নীতি, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সমন্বয় এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে তাঁর ভূমিকা ছিল।
তবে মিলারের পরিচয়ের কেন্দ্রেই রয়েছে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসননীতি। দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার করার পরিকল্পনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিন ৩ হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণের পেছনেও ছিলেন মিলার। সেই লক্ষ্য পূরণে কয়েক দশক ধরে অ্যামেরিকায় বসবাস করা অভিবাসীরাও ফেডারেল এজেন্টদের অভিযানের আওতায় আসেন। ফলে তাঁর পদোন্নতি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বের পরিবর্তন নয়; সীমান্ত, অভিবাসন ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতিতে ট্রাম্পের অবস্থান আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
কিন্তু এই নীতিই নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চাপ হয়ে উঠেছিল। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের নির্বাচনী ভোটার জরিপে প্রায় ১০ জনের মধ্যে ছয়জন বলেছেন, প্রশাসনের অভিবাসন আইন প্রয়োগের অভিযান সীমা ছাড়িয়েছে। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট—আইসিই কীভাবে দায়িত্ব পালন করেছে, তা নিয়েও একই অনুপাতে ভোটারের অসন্তোষ ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে মিলারকে আরও বড় দায়িত্ব দেওয়া ট্রাম্পের নীতিগত অবস্থান বদলের ইঙ্গিত দেয় না; বরং সমালোচিত সেই নীতির প্রতি তাঁর আস্থা অটুট থাকার বার্তা দেয়।
এবারের নির্বাচনের বার্তা অবশ্য শুধু অভিবাসন ইস্যুতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এপি’র ভোটার জরিপে প্রায় ১০ জনের মধ্যে ছয়জন খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার মনে করেছেন, ট্রাম্পের নীতিতে অর্থনীতির অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে; একই অনুপাতের ভোটার বলেছেন, প্রেসিডেন্টের অগ্রাধিকার সঠিক নয়। আর প্রায় ১০ জনের মধ্যে সাতজন মনে করেছেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কংগ্রেস যথেষ্ট ভূমিকা রাখেনি। এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদেরও প্রায় ১০ জনের মধ্যে চারজন এই মত দিয়েছেন। অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের জয়কে শুধু দলীয় জনপ্রিয়তার উত্থান হিসেবে দেখলে নির্বাচনের মূল বার্তাটি ধরা পড়বে না। ভোটারদের একটি বড় অংশ চেয়েছেন, প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের ওপর কংগ্রেস আরও কার্যকর নজরদারি করুক।
এই বাস্তবতায় হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পদটি শুধু প্রেসিডেন্টের সময়সূচি বা কর্মীদের পরিচালনার মধ্যে সীমিত নয়। নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়, প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনের রাজনৈতিক কৌশল সাজাতেও চিফ অব স্টাফের বড় ভূমিকা থাকে। মিলার প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ও ফেডারেল সরকারের কার্যপ্রণালি সম্পর্কে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এপি বলছে, শেষ দুই বছরে তাঁর এই দক্ষতা ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতারও আইনি ও সাংবিধানিক সীমা রয়েছে; কংগ্রেস ও আদালতের ভূমিকা সেই সীমা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে সুজি ওয়াইলসের বিদায়ও হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের তাৎপর্য বহন করছে। ২০২৪ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণাকে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে পরিচালনার কৃতিত্ব পেয়েছিলেন তিনি। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের প্রথম নারী চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রেসিডেন্টের অস্থির কর্মধারার মধ্যে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চারজন চিফ অব স্টাফ বদল হলেও ওয়াইলস ছিলেন তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনকারী চিফ অব স্টাফ। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি তাঁর রাজনৈতিক সংগঠনে কাজ করবেন। ওয়াইলসও বলেছেন, দায়িত্ব বদলালেও প্রেসিডেন্ট ও তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের প্রতি অঙ্গীকার বদলাবে না।
ডেমোক্র্যাটদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য কঠোর। হাউযের শক্তিশালী ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান হতে যাওয়া রবার্ট গার্সিয়া মিলারকে আইসিইর বিতর্কিত অভিযানের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, মিলারের পদোন্নতি প্রশাসনের কঠোর নীতির ধারাবাহিকতাই নির্দেশ করে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্সও বলছে, এই নিয়োগকে প্রশাসনের আরও আক্রমণাত্মক অভ্যন্তরীণ নীতি ও রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এখানেই আরেকটি বাস্তবতা আছে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও তা তাদের সব নীতি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নয়। ভোটারদের বড় অংশ দল দুটির প্রতিই অসন্তুষ্ট; ডেমোক্র্যাটদের পক্ষেও নিরঙ্কুশ জনসমর্থনের প্রমাণ নেই। বরং তাদের ওপরও দায়িত্ব পড়েছে তদন্ত, নজরদারি ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ভোটারদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানোর।
সুতরাং, মিলারের নিয়োগকে ট্রাম্পের পরাজয়ের পর সাধারণ কর্মী পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এটি তাঁর প্রশাসনের পরবর্তী পর্যায়ের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনারও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। একদিকে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস নজরদারি বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাম্প তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কঠোর নীতির সহযোগীকে প্রশাসনের কেন্দ্রে আনছেন। সামনে সংঘাত বাড়বে, নাকি দুই পক্ষ কোনো সমঝোতার পথ খুঁজবে—তা এখনই নিশ্চিত নয়। তবে স্পষ্ট, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হোয়াইট হাউসের অগ্রাধিকার বদলের বদলে আরও দৃঢ় হওয়ার ইঙ্গিতই দিচ্ছে এই নিয়োগ।
