


প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮ ২০২৫, ১০:০০

এই চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ-পরিসরের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম 'সিপার' পাচ্ছে বাংলাদেশ। ছবি: বাংলাদেশ মিলিটারি ফোর্স
দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দিকে এগুচ্ছে বাংলাদেশ। তুরস্কের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে ঢাকা।
এই চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ-পরিসরের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সিপার পাচ্ছে বাংলাদেশ। পাশাপাশ যুক্ত হতে পারে সম্ভাব্যভাবে তুর্কি যুদ্ধমানবিহীন ড্রোনের যৌথ উৎপাদনেও।
এশিয়া টাইমসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদতে এটি শুধু একটি অস্ত্র চুক্তি মনে হলেও, বাস্তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী দেশগুলোর মাঝে নিজের পথ কৌশলগতভাবে তৈরি করার একটি সাহসী ঘোষণা।
বাংলাদেশের জন্য এটি সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ক্রয় আর তুরস্কের জন্য এটি ক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয় হলেও প্রতিবেশী ভারতের জন্য এটি একটি নতুন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বহু বছর ধরেই প্রতিবেশী মিয়ানমারে চলা নিষ্ঠুর গৃহযুদ্ধের প্রভাব সীমা পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে পড়ছে। ছিটফোট গোলাবারুদ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসে পড়েছে। চীন ও রাশিয়া থেকে সংগ্রহ করা মিয়ানমারের সামরিক বিমানগুলো বাংলাদেশি আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে।
মূল সমস্যা হচ্ছে, বর্তমান সময়ে সরকারের হাতে পর্যাপ্ত কার্যকর সরঞ্জাম নেই। বাংলাদেশের বিদ্যমান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত পুরনো এবং স্বল্প-পরিসরের সিস্টেমের সমন্বয়, ফলে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যেমন চট্টগ্রাম বন্দর এবং কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলো বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে ভারতের সদা উপস্থিত ছায়া। সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হলেও, ঢাকার কোনো সামরিক পরিকল্পনাকারী ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর বড় মাত্রার এবং উচ্চমানের ক্ষমতাকে উপেক্ষা করতে পারবে না।
সুতরাং, বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকীকরণের দুটি লক্ষ্য। এক দিকে মিয়ানমার থেকে উদ্ভূত তাৎক্ষণিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা তৈরি করা, আর অন্য দিকে শক্তিশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভারসাম্য পুনঃস্থাপন করা।
তুরস্কের এই প্যাকেজ প্রায় নিখুঁত সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। মধ্যপরিসরের হিসার-ও প্লাস এবং দীর্ঘপরিসরের সিপার সিস্টেমের সমন্বয় কেবল ঘাটতি পূরণের জন্য নয় বরং এটি সম্পূর্ণ নতুন, আধুনিক এবং সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা ঢাল তৈরি করার উপায়।
প্রথমবারের মতো ঢাকা নিজের আকাশসীমা রক্ষা করার ক্ষমতা অর্জন করবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র সম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ। এটি জানান দিচ্ছে, বাংলাদেশ চিরকাল শুধু অস্ত্র ক্রেতা হিসেবে থাকতে চায় না। যৌথ উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজের মানবসম্পদ এবং শিল্পভিত্তিতে বিনিয়োগ করছে।
পুরো কৌশলটি হেজিং বা ঝুঁকি বণ্টনের একটি দৃষ্টান্ত। শুধু চীন, রাশিয়া বা পশ্চিমের উপর নির্ভর না করে, বাংলাদেশ সচেতনভাবে নিজস্ব অংশীদারি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করছে। শক্তিশালী ন্যাটো সদস্য এবং স্বাধীন মনোভাবসম্পন্ন তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করে, ঢাকা অন্য সকল অংশীদারদের মধ্যে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ গ্রাহক রাষ্ট্র হতে ইচ্ছুক নয়।
সিপারের মতো সিস্টেমের জন্য, তুরস্কের প্রথম নিজস্ব দীর্ঘ-পরিসরের ইন্টারসেপ্টর হিসেবে, বাংলাদেশকে ক্রেতা হিসেবে পাওয়া তুরস্কের জন্য একটি বড় আস্থা প্রদর্শন হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তবে ভারতের জন্য বিষয়টি জটিল হয়ে উঠছে। কেননা সরবরাহকারী তুরস্ক, চীন নয়। নয়াদিল্লির কাছে চীনের প্রভাব মোকাবেলার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল আছে, কিন্তু ন্যাটো সদস্য হিসেবে তুরস্কের মতো একটি স্বাধীন শক্তিশালী দেশ বাংলাদেশকে প্রযুক্তি বিক্রি করছে—এটি নতুন পরিস্থিতি। এটি চীনের ভূমিকা কমালেও এটি প্রতিস্থাপন করছে অন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন দেশ।
বাংলাদেশে অবস্থানের অধিকারের ফলে তুরস্ক বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত উপস্থিতি পাবে এবং ব্ল্যাক সি থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত তার প্রভাব বাড়বে। নয়াদিল্লিতে এটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতীয় সামরিক বাহিনী তাদের শক্তিশালী অবস্থানের বিষয়ে চিন্তিত না হলেও, তাদের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ কৌশলগত হিসেবব নষ্ট হচ্ছে।
এই পদক্ষেপ ভারতের কূটনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল করছে এবং দেখাচ্ছে যে নিকটতম প্রতিবেশীর ক্ষেত্রেও ভারতের প্রভাব সবসময় কার্যকর নয়।
