ইরান চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি, ‘পছন্দ না হলে আবারও বোমা হামলা চালাবে অ্যামেরিকা’

টিবিএন ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ১৭ ২০২৬, ১৭:১০
- 0
ট্রাম্পের ভাষায়, এটি কেবল একটি “মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং” বা সমঝোতা স্মারক। চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে ইরান ব্যর্থ হলে বা ওয়াশিংটন অসন্তুষ্ট হলে “আবারও বোমা হামলা” চালানো হতে পারে বলেও তিনি হুশিয়ারি দেন। তার এই মন্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন অ্যামেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি থেকে স্থায়ী শান্তির পথে এগোনোর আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে সদ্য হওয়া অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-সেভেন সম্মেলনে বুধবার তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বর্তমান সমঝোতা চূড়ান্ত নয় এবং তিনি সন্তুষ্ট না হলে অ্যামেরিকা আবারও সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে।
ট্রাম্পের ভাষায়, এটি কেবল একটি “মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং” বা সমঝোতা স্মারক। চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে ইরান ব্যর্থ হলে বা ওয়াশিংটন অসন্তুষ্ট হলে “আবারও বোমা হামলা” চালানো হতে পারে বলেও তিনি হুশিয়ারি দেন। তার এই মন্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন অ্যামেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি থেকে স্থায়ী শান্তির পথে এগোনোর আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।
ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-ব্যাঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-সেভেন সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতারা ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও তুলে ধরেন।
জি-সেভেন নেতাদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সমাধানে পৌঁছাতে হবে যাতে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। অ্যামেরিকা, বৃটেইন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, জাপান ও ক্যানাডা—সব দেশই এ বিষয়ে একমত হলেও যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপকে তারা প্রকাশ্যে সমর্থন করেনি।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি অ্যামেরিকা ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন পর্যন্ত সাত হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হবে, যাতে স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য বিস্তারিত আলোচনা চালানো যায়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প যেসব লক্ষ্য সামনে রেখেছিলেন, তার অনেকগুলোই এখনও অর্জিত হয়নি। ইরানের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় বহাল রয়েছে, দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ এখনও হস্তান্তর করা হয়নি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। একইভাবে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনও অব্যাহত রয়েছে।
চুক্তির সবচেয়ে জটিল দিকগুলোর একটি হলো লেবানন ফ্রন্ট। ইরান বলছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হলে লেবাননেও সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং ইসরাইলকে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুর সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা দখল করা নিরাপত্তা অঞ্চল ছাড়বে না এবং প্রয়োজন হলে সামরিক অভিযান চালানোর অধিকার বজায় রাখবে।
এই ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেল আভিভের মধ্যে মতপার্থক্যও প্রকাশ্যে এসেছে। ট্রাম্প সম্প্রতি ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে জি-সেভেন নেতারা লেবাননে “শক্তিশালী ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি” এবং হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে চুক্তির অর্থনৈতিক দিকও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, অ্যামেরিকা-ইরান কাঠামোগত চুক্তির অংশ হিসেবে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি “রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফান্ড” গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং উভয় পক্ষকে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করা।
সূত্রগুলোর দাবি, তহবিলের অর্ধেকেরও বেশি অর্থায়ন ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। তবে এই অর্থ কোনো রাষ্ট্রীয় অনুদান নয়। বরং অ্যামেরিকা, উপসাগরীয় দেশ, এশিয়া, দক্ষিণ অ্যামেরিকা ও আফ্রিকার বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে গঠিত হবে। জ্বালানি, পরিবহন, উৎপাদন শিল্প ও অবকাঠামো খাতে এই বিনিয়োগ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ট্রাম্প নিজে এ তহবিলকে অ্যামেরিকার বিনিয়োগ হিসেবে বর্ণনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটন “এক সেন্টও” বিনিয়োগ করবে না এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকেও এখনই বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে না। তার মতে, ভবিষ্যতে ইরানের আচরণ ও চুক্তি বাস্তবায়নের ওপরই সবকিছু নির্ভর করবে।
এদিকে, যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮০ ডলারের নিচে নেমে আসে, যা সংঘাত শুরুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়। তবে কূটনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথ এখনও দীর্ঘ এবং নানা রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক জটিলতায় পরিপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

