হরমুজে জাহাজে হামলা হলেই ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা, নতুন হুমকি ট্রাম্পের
- 0


প্রকাশিত: জুলাই ২২ ২০২৬, ১৬:৩০
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যেন প্রতিদিনই নতুন মোড়ে নিচ্ছে। একটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে আঘাতের শিকার হবে। তারপর কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের কোনো সেতু কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হবে অ্যামেরিকার হামলায়। এমন এক নতুন যুদ্ধের সমীকরণ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এর অর্থ, হরমুজে প্রতিটি হামলা এখন শুধু একটি জাহাজের ক্ষতি নয়; সেটি হয়ে উঠতে পারে ইরানের ভেতরে নতুন হামলার ট্রিগার। আর সেই সঙ্গে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ।
গত মাসে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার পর অ্যামেরিকা ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা দ্রুত নতুন রূপ নিয়েছে। একদিকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা বাড়ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন সেই হামলার জবাব আর শুধু সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলছে না। এবার সরাসরি বেসামরিক অবকাঠামোকেও প্রতিশোধের লক্ষ্য হিসেবে সামনে এনেছেন ট্রাম্প।
বুধবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন কিংবা অন্য কোনো অস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে প্রতিবারই জবাবে ইরানের একটি করে সেতু অথবা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবে অ্যামেরিকা। এমনকি তেহরানের আশপাশের স্থাপনাও এই ঘোষণার বাইরে থাকবে না।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন গত মাসে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। গত কয়েক দিনে অ্যামেরিকা ও ইরান উভয় পক্ষই একে অপরের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, বিস্ফোরণ এবং নৌ চলাচলে বিঘ্নের ঘটনা বিশ্ববাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক হামলাগুলোর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এই হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। একাধিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার প্রকাশ্য ঘোষণা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জেনেভা কনভেনশন এবং সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইনে বেসামরিক স্থাপনায় ইচ্ছাকৃত হামলা নিষিদ্ধ।
ইউরোপের কয়েকজন নেতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলও ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, এই ধরনের অবস্থান সংঘাত প্রশমনের পরিবর্তে আরও বড় সামরিক মোকাবিলার পথ খুলে দিতে পারে। কূটনীতিকদের মতে, হরমুজকে ঘিরে প্রতিশোধের এই নতুন সমীকরণ যুদ্ধকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, একটি দেশের বেসামরিক অবকাঠামোও নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
অন্যদিকে তেহরান এখনো ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকির আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। তবে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব আগেই সতর্ক করে বলেছে, দেশের ওপর নতুন কোনো হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে "আরও কঠোর ও বিস্তৃতভাবে"। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন একটি ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি জাহাজে হামলার ঘটনাও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একাধিক দেশে সামরিক অভিযানের কারণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের হিসাব আর শুধু সীমান্ত বা সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে জ্বালানি অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও সরাসরি কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশ যুদ্ধবিরতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ট্রাম্পের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি স্পষ্ট করে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে প্রতিটি নতুন হামলা এখন শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়—এটি মুহূর্তেই আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতের সূচনা করতে পারে।
