মধ্যবর্তী নির্বাচন
ট্রাম্পের জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের হস্তক্ষেপ, ভাঙলো দীর্ঘদিনের রীতি
- 0


প্রকাশিত: নভেম্বর ২ ২০২৬, ১৬:৫৬
অ্যামেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক দিন আগে ভোটের প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এর মধ্য দিয়ে তারা কয়েক দশকের প্রচলিত রীতি ভেঙেছে। আইন প্রয়োগের ক্ষমতা যাতে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষে না যায় তা এতদিন নিশ্চিত করা হতো।
ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০ হাজারের বেশি ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট আলাদা করে রাখার উদ্যোগ এবং আলাস্কায় সেনেট নির্বাচনের ফল প্রত্যয়ন আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট। তবে দুই স্টেইটের ক্ষেত্রেই আদালতের বাধার মুখে পড়েছে প্রশাসনের পদক্ষেপ। একই সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ার কথিত অ-নাগরিক ভোটারদের তালিকা নিয়ে নতুন করে আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সুবিধা হয়—এমন পরিস্থিতি এড়াতে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট ঐতিহাসিকভাবে সতর্ক অবস্থান নিলেও এবার সেই প্রচলিত নীতিতে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন—ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই কেন ভোটারদের যোগ্যতা ও নির্বাচনের ফল নিয়ে তদন্তে নামছে ফেডারেল সরকার? এর পেছনে কি শুধু নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ, নাকি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কাও রয়েছে?
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ক্যালিফোর্নিয়ায়। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, স্টেইটটিতে ২০ হাজারের বেশি অ-নাগরিক ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন এবং তাঁদের কাছে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো হয়েছে। এ কারণে তাঁদের ব্যালট আলাদা করে রাখা এবং যাচাই না হওয়া পর্যন্ত গণনা বন্ধ রাখার দাবি জানায় জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট। তবে ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ বলছে, অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে এবং ফেডারেল সরকারের দেওয়া তালিকায় গুরুতর ভুল থাকতে পারে। আদালতও নির্বাচনের ঠিক আগে বিপুলসংখ্যক ব্যালট আলাদা করার উদ্যোগ আটকে দিয়েছে। ৩০ অক্টোবর নাইন্থ সার্কিট আপিল আদালত ২-১ ভোটে জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এতে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পুরো ভোট গণনার প্রক্রিয়া ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এই বিতর্ক আরও জটিল হয়েছে কথিত অ-নাগরিক ভোটারদের তালিকা যাচাই নিয়ে। শুক্রবার ওয়াশিংটনের একটি ফেডারেল আদালত নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কোয়ালিশন ফর হিউম্যান ইমিগ্র্যান্ট রাইটস অব লস অ্যাঞ্জেলেস—চিরলা—এবং ইউসিএলএর ভোটাধিকার প্রকল্পকে ওই তালিকার তথ্য পর্যালোচনার সুযোগ দেন। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তালিকায় থাকা ৪০ শতাংশের বেশি ব্যক্তির নাম ক্যালিফোর্নিয়ার বর্তমান ভোটার তালিকায় নেই। অন্তত ২২ জনকে সম্ভাব্য স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া অ্যামেরিকান নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। আরও কয়েক হাজার অ্যামেরিকান নাগরিকের নামও ভুলভাবে তালিকায় থাকতে পারে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
কিন্তু এই বিশ্লেষণ প্রকাশের পর সংগঠনটির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ তোলার উদ্যোগ নিয়েছে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট। ডিওজের দাবি, আদালত তালিকার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সংগঠনটি সেই নির্দেশের সীমা অতিক্রম করেছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার তদন্তের সুপারিশ করেছে তারা। অন্যদিকে, সংগঠনটির আইনজীবীরা বলেছেন, আদালতের নির্দেশ পুরোপুরি মেনেই তাঁরা কাজ করেছেন। ফলে তালিকাটির নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি আদালতের নির্দেশ পালনের বিষয়টিও নতুন বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
আলাস্কাতেও নির্বাচনের আগে একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেখানে রিপাবলিকান সেনেটর ড্যান সালিভানের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলা। একই নামে আরেক প্রার্থী ড্যান জে সালিভান নির্বাচনে থাকায় ভোটাররা বিভ্রান্ত হতে পারেন—এমন অভিযোগ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ কারণে রিপাবলিকান সেনেটর সালিভান অল্প ব্যবধানে হারলে নির্বাচনের ফল প্রত্যয়ন আটকে দেওয়া এবং ভোট নিয়ে তদন্তের নির্দেশ চেয়ে আদালতে যায় জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু রোববার ফেডারেল বিচারক শ্যারন গ্লিসন মামলাটি খারিজ করে দেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ইতিমধ্যে অনেক ভোট পড়ে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যালট আলাদা করে তদন্ত করতে গেলে ভোটারের গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। নির্বাচনের আগে এভাবে নিয়ম পরিবর্তনের উদ্যোগও সাংবিধানিক সীমার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে রায় মেনে না নিয়ে আপিল করেছে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট।
এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন আইনি বিরোধ হিসেবে দেখছেন না নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে তদন্ত ও মামলা শুরু হলে ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হতে পারে এবং ফল নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হতে পারে। সাবেক ইউএস অ্যাটর্নি জেনারেল পিটার কিসলার, যিনি রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় দায়িত্ব পালন করেছিলেন, বলেছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে রাজনৈতিক বিরোধে কোনো পক্ষ না নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মতে, আলাস্কার ঘটনায় শুধু পক্ষপাতের চেহারাই নয়, বাস্তবেও এক পক্ষের সুবিধা নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে, জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের অভ্যন্তরীণ তদন্তনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। আগে নির্বাচনি অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে বিভাগের পাবলিক ইন্টিগ্রিটি সেকশন—যেখানে নির্বাচন আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা কাজ করতেন—গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিত। সাধারণত নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন হওয়ার আগে তদন্তে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করার পরামর্শ দেওয়া হতো, যাতে ভোটের ফল ও রাজনৈতিক পরিবেশ প্রভাবিত না হয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এই ইউনিটের আকার কমিয়েছে এবং নির্বাচনি দুর্নীতির তদন্তে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের ডিওজের সঙ্গে পরামর্শ করার বাধ্যবাধকতাও স্থগিত করেছে। রয়টার্সের তিনটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন তদন্ত নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলে ট্রাম্পের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারাই তা নিষ্পত্তি করবেন।
তবে প্রশাসন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চের বক্তব্য, ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই তাঁরা আইনের প্রয়োগ করছেন। জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র কিয়ের্স্টেন ফেলস বলেছেন, কোনো নির্বাচনি প্রচারণায় সহায়তা করা তাঁদের উদ্দেশ্য নয়; তাঁরা শুধু আইন কার্যকর করছেন।
অন্যদিকে, ভোটার অধিকারকর্মীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অ্যামেরিকার সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব স্টেইটগুলোর। স্বাধীন গবেষণা ও বিভিন্ন স্টেইটের নিরীক্ষায়ও দেখা গেছে, ব্যাপক ভোটার জালিয়াতির ঘটনা বিরল। ট্রাম্প অবশ্য ২০২০ সালের নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ করে আসছেন, যদিও তাঁর পরাজয় চ্যালেঞ্জ করে করা ৬০টির বেশি মামলার কোনোটিই সফল হয়নি।
আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচন তাই শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না; নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বাধীনতা, ভোটারদের অধিকার এবং ফেডারেল সরকারের ক্ষমতার সীমা নিয়েও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। ক্যালিফোর্নিয়া ও আলাস্কার আদালতের সিদ্ধান্তে প্রশাসনের কয়েকটি উদ্যোগ আটকে গেলেও, তদন্ত ও আপিলের প্রক্রিয়া চলছে। শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল নিয়ে বিতর্ক কতটা দূর গড়ায় এবং নির্বাচনের পরও আইনি লড়াই অব্যাহত থাকে কি না, এখন সেদিকেই নজর।
