সৌদির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির একদিন পরেই ট্রাম্পের নতুন শর্ত আরোপ
- 0


প্রকাশিত: জুলাই ২৩ ২০২৬, ১৭:০১
অ্যামেরিকার সঙ্গে সৌদি আরবের স্বাক্ষরিত পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের একদিন পরই প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নতুন শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেন, সৌদি আরবকে এই চুক্তির সুবিধা পেতে হলে আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে হবে। নতুন এই শর্তে এমন একটি সমঝোতা আবারও মধ্যপ্রাচ্যের জটিল কূটনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে, যা এর আগেও একই কারণে আটকে গিয়েছিল।
বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, অ্যামেরিকার এনার্জি ডিপার্টমেন্ট ও সৌদি আরবের মধ্যে হওয়া বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি অনুমোদন পাবে, তবে সেটি পুরোপুরি নির্ভর করবে সৌদি আরব আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেয় কি না তার ওপর। তিনি দাবি করেন, এই কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ বা বেসামরিক ব্যবহারের জন্য হবে এবং এতে সামরিক উদ্দেশ্যে পারমাণবিক কার্যক্রমের সুযোগ থাকবে না।
ট্রাম্পের এই অবস্থান বিস্ময় তৈরি করেছে, কারণ বুধবারই দুই দেশ একটি ঐতিহাসিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে সই করে। অ্যামেরিকার এনার্জি ডিপার্টমেন্ট জানায়, এই চুক্তি সৌদি আরবের সঙ্গে কয়েক দশকব্যাপী বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার আইনি ভিত্তি তৈরি করবে। এর মাধ্যমে সৌদি আরব ভবিষ্যতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে এবং অ্যামেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোও দেশটির পারমাণবিক জ্বালানি খাতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
তবে দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো—এটি সৌদি আরবকে ভবিষ্যতে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পথ খুলে দিতে পারে। যদিও সেই সক্ষমতা গড়ে তোলার আগে যৌথ প্রযুক্তিগত মূল্যায়নসহ একাধিক ধাপ পার হতে হবে, তবু বিষয়টি অ্যামেরিকান কংগ্রেসে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বহু আইনপ্রণেতার আশঙ্কা, আরও দেশকে সংবেদনশীল পারমাণবিক প্রযুক্তির সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের ভূখণ্ডে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়। একই সঙ্গে দেশটির কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অতীতে বলেছিলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও সেই সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করবে। ফলে রিয়াদের যেকোনো পারমাণবিক কর্মসূচিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ট্রাম্পের নতুন শর্তটি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বাস্তবতায় আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৩ সালে হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু গাযা যুদ্ধ শুরুর পর সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। এরপর থেকে রিয়াদ স্পষ্ট জানিয়ে আসছে, স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ নিশ্চিত না হলে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি হবে না। গাযায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর সৌদি জনমতও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
এই কারণেই ট্রাম্পের নতুন শর্তকে অনেক বিশ্লেষক শুধু পারমাণবিক নীতির প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণের অংশ বলেই মনে করছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনও সৌদি আরবের সঙ্গে একই ধরনের পারমাণবিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করেছিল। তখনও ওয়াশিংটন সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করাকেই প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে রেখেছিল। সেই আলোচনা শেষ পর্যন্ত অগ্রসর হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের বুধবারের চুক্তিতে এমন কোনো শর্ত ছিল না বলেই ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু একদিনের ব্যবধানে ট্রাম্পের নতুন ঘোষণায় সেই পুরোনো শর্তই আবার ফিরে এসেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, সৌদি আরব কি নিজের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাঁটবে, নাকি প্যালেস্টাইন ইস্যুতে আগের অবস্থানেই অনড় থাকবে। সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, বহুল আলোচিত অ্যামেরিকা-সৌদি পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়নের পথে এগোবে, নাকি আবারও কূটনৈতিক অচলাবস্থায় আটকে যাবে।
