অ্যামেরিকাকে হরমুজের ‘গার্ডিয়ান’ দাবি ট্রাম্পের, বিনিময়ে চাইলেন অর্থ
- 0


প্রকাশিত: জুলাই ১৩ ২০২৬, ১৬:০৪
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার তিনি বলেছেন, অ্যামেরিকা প্রণালিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং এর বিনিময়ে অন্যান্য দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থও নেবে। অন্যদিকে তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অ্যামেরিকার কোনো ভূমিকা নেই। পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মধ্য দিয়ে দুই দেশের উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়ায় গত মাসে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমরা হরমুজ প্রণালি রক্ষা করব, সম্ভবত এর পরিচালনাও করব। আমরা প্রণালিটির অভিভাবক হয়ে উঠব। চাইলে একে ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল অব দ্য স্ট্রেইট’ বলা যেতে পারে। আর এই দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের অর্থও পরিশোধ করতে হবে।”
তার দাবি, বিশ্বের অনেক ধনী দেশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল এবং তারা অ্যামেরিকার মিত্র। তাই বিনা মূল্যে এত বড় দায়িত্ব বহন করার কোনো কারণ নেই।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথ ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
গত শনিবার অনুমোদনহীনভাবে জাহাজ চলাচলের অভিযোগ তুলে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয় ইরান। পরদিন তেহরান জানায়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থগিত থাকবে এবং পরবর্তীতে অনুমতি সাপেক্ষে চলাচল করা যাবে।
ট্রাম্প অভিযোগ করেন, দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হলেও ইরান তা বারবার ভঙ্গ করেছে। তার ভাষায়, “চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু তারা সেটি ভেঙে দিয়েছে। তারা সব সময়ই চুক্তি ভাঙে। তাদের সঙ্গে আমাদের দশটি চুক্তি হয়েছিল, আর প্রতিবারই তারা কথা রাখেনি। এবার অ্যামেরিকা কঠোর জবাব দিবে।”
এর জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ যৌথ সামরিক কমান্ড জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার অ্যামেরিকার নেই। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করার একমাত্র উপায় হলো অ্যামেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। অন্যথায় বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস খাতে আরও বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে।
সপ্তাহান্ত থেকে সোমবার পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা অ্যামেরিকান সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এছাড়া ওমানের কয়েকটি রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস এবং জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটির জ্বালানি ও গোলাবারুদের ডিপোতে আঘাত হানার কথাও জানিয়েছে তারা।
অন্যদিকে অ্যামেরিকান সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং আইআরজিসির ব্যবহৃত ছোট নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, সোমবার দক্ষিণাঞ্চলের কেশম, বন্দর আব্বাস ও আবাদান এলাকার সামরিক স্থাপনাগুলোতেও হামলা হয়েছে। আবাদানে অন্তত দুইজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরানি গণমাধ্যম।
গত মাসে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার লক্ষ্যে অ্যামেরিকা ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের আলোচনার যে অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে সেটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদিও ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিকে কার্যত শেষ বলে মন্তব্য করেছেন, তবুও ভবিষ্যতে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেননি।
অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘেইর গালিবাফ সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই বলেছিলাম—প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুন, নইলে মূল্য দিতে হবে।”
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের মধ্যেই ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনার একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনা এগোলেও অ্যামেরিকার চাপের কারণে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যুদ্ধের আগে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হতো। এখন জাহাজ চলাচলে স্থায়ী অনুমতিপত্র ও ফি ব্যবস্থাও চালু করতে চায় তেহরান।
এদিকে অ্যামেরিকা দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তাদের বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ করছে না। তবে জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান মেরিনট্রাফিক জানিয়েছে, ১০ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ৫২ শতাংশ কমে গেছে। উত্তেজনার জেরে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যদিও তা যুদ্ধের শুরুর সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
