রাশিয়া থেকে মিলিয়ন ব্যারেল ডিজেল আনার ঘোষণা ট্রাম্পের, ক্ষুব্ধ ইউক্রেন
- 0


প্রকাশিত: অক্টোবর ১০ ২০২৬, ৩:৪৩
আমেরিকায় ডিজেলের ঊর্ধ্বমুখী দাম কমাতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, দুই নেতার টেলিফোনে আলোচনার পর ট্রাম্প জানান, রাশিয়া অবিলম্বে ৩০০ হাজার টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। পরবর্তী মাসগুলোতে আরও সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মস্কো। এই জ্বালানি আমদানির সুযোগ দিতে রাশিয়ার ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও সাময়িকভাবে শিথিল করেছে ওয়াশিংটন। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
কয়েক ধাপে আসবে ডিজেল
ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, রাশিয়া তাৎক্ষণিকভাবে ৩০০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। নভেম্বরে আরও ৫০০ হাজার টন এবং এরপর ১ মিলিয়ন টন দেওয়ার কথা রয়েছে। রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর অবস্থা অনুকূলে থাকলে পরবর্তী সময়ে আরও জ্বালানি সরবরাহ করা হতে পারে।
রয়টার্সের হিসাবে, প্রাথমিক ৩০০ হাজার টন ডিজেল প্রায় ২ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ব্যারেলের সমান। অন্যদিকে, আমেরিকা প্রতিদিন প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করে। ফলে নতুন সরবরাহের পরিমাণ বাজারের সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় সীমিত হতে পারে।
কেন এই উদ্যোগ?
ডিজেলের দাম ৭০ শতাংশ বেড়েছে আমেরিকায় ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে। আমেরিকার অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ছিল ৬ ডলার ২৮ সেন্ট—এক বছর আগের ৩ ডলার ৬৮ সেন্টের তুলনায় দেড়গুনের বেশি।
ডিজেল পরিবহন, কৃষিকাজ ও বাড়ি গরম রাখার কাজে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। ফলে এর দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচেও চাপ পড়ে, যার প্রভাব পড়তে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।
এর আগে জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে মিত্র দেশগুলোকে জরুরি মজুত ছাড়ার জন্য চাপ দিয়েছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি কৃষিকাজে ব্যবহৃত করমুক্ত লাল রঙের ডিজেল সড়কে ব্যবহারের সুযোগও সম্প্রসারণ করেছেন তাঁর প্রশাসন। তবে এসব পদক্ষেপের পরও দাম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞায় ছাড়
ডিজেল সরবরাহ সহজ করতে আমেরিকার অর্থ মন্ত্রণালয় রুশ ডিজেল আমদানির অনুমতি দিয়ে একটি সাময়িক লাইসেন্স জারি করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এই অনুমতির মেয়াদ ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর মস্কোর জ্বালানি আয় সীমিত করতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে রুশ তেল কোম্পানিগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন সমঝোতা সেই চাপের নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রুশ জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় বাড়লে মস্কো আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। সেই অর্থ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকেও সহায়তা করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে রয়টার্স।
জেলেনস্কির আপত্তি
সমঝোতার সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর ভাষায়, শক্তিশালী মিত্রদের কাছ থেকে এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, পুতিনকে দেওয়া উপহার শান্তি আনবে না।
জেলেনস্কির অভিযোগ, রাশিয়াকে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বিক্রির সুযোগ দেওয়া মানে এমন একটি যুদ্ধের পেছনে বিনিয়োগ করা, যে যুদ্ধের অবসান হওয়া উচিত। একই সময়ে ইউক্রেনের একটি প্রতিনিধিদল আমেরিকায় যুদ্ধের সমাধান নিয়ে আলোচনার জন্য অবস্থান করছিল।
আমেরিকার রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ডন বেকনও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য কংগ্রেসে পাস হওয়া নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা উচিত, শিথিল নয়।
ডিজেলের দাম কি কমবে?
রাশিয়ার সরবরাহ বাড়লে বাজারে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। তবে এতে দীর্ঘমেয়াদে দাম কমে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
জ্বালানি বিশ্লেষক ররি জনস্টন এই সমঝোতার সম্ভাব্য প্রভাবকে খুব সীমিত বলে বর্ণনা করেছেন। আর উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষক জিম মিচেলের মতে, এটি সংকটের সমাধান নয়; বরং ইতিমধ্যে চাপে থাকা ডিজেলবাজারে সরবরাহের আরেকটি উৎস।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমঝোতার খবরের পর আমেরিকায় ডিজেল ফিউচারের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে যায়। তবে বাজারে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া আর দীর্ঘমেয়াদি মূল্যহ্রাস এক বিষয় নয়। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি, শোধনাগারের সক্ষমতা এবং যুদ্ধজনিত বিঘ্নের ওপরও দাম নির্ভর করবে।
এদিকে, ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর উপায়ও খতিয়ে দেখছে ট্রাম্প প্রশাসন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, তেল ও জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইন ব্যবহারের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
