

প্রকাশিত: অক্টোবর ১০ ২০২৬, ১৭:২৮

কিশোরী জান্নাতুল তাজমিনকে ধর্ষণ ও হত্যায় অভিযুক্ত মো. সুমন মিয়া (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)।
কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৫) ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামি মো. সুমন মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শনিবার সন্ধ্যায় কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হকের আদালতে জবানবন্দি দেন অভিযুক্ত । পরে আদালত তকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শনিবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কুমিল্লার আদালত পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান।
এর আগে শনিবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, গত বুধবার রাতে নগরের পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় তাজমিনকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অটোরিকশায় তোলেন সুমন। পরে তাকে লালমাই উপজেলার একটি কৃষিজমিতে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করেন। এরপর তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থলে অটোরিকশাটি ফেলে পালিয়ে যান তিনি।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশার নিবন্ধন নম্বরের সূত্র ধরে সুমনকে শনাক্ত করা হয়। শুক্রবার চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি এলাকা থেকে ডিবি ও লালমাই থানা-পুলিশের যৌথ দল তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার জন্য সুমনের অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। ভাড়া ঠিক হয় ৩০০ টাকা। পথে চালককে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনায় ।
অভিযোগ অনুযায়ী, সুমন শহরের দিকে না গিয়ে শর্টকাট পথে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন রাস্তা ঘুরিয়ে তাজমিনকে লালমাই উপজেলার জগৎপুর এলাকার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। জায়গাটি অপরিচিত মনে হওয়ায় তাজমিন অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় সুমন তাকে আটকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে ভুক্তভোগী বাধা দেয়। দুজনের ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে অটোরিকশাটি সড়কের পাশের ধানখেতে কাত হয়ে পড়ে যায়।
পুলিশের ভাষ্য, তাজমিন নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করলে সুমন তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে ধানখেতের কাদামাটিতে পা দিয়ে তার মাথা চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পর তাজমিনের ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থলে অটোরিকশাটি ফেলে যান সুমন। পরে স্থানীয় কাচিকাঁটা মসজিদের সামনের একটি পুকুরে গোসল করে অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় যান। সেখানে একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে চলে যান তিনি।
যেভাবে নিখোঁজ হয় তাজমিন
পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এ সময় মায়ের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে কথা বলে বান্ধবীর বাসায় আছেন বলে জানায়।
তবে তাজমিনের মুঠোফোনের কললিস্ট ও অবস্থান বিশ্লেষণ করে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানতে পারেন, ৪ অক্টোবর তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরদিন ৫ অক্টোবর কুমিল্লায় ফিরে ভোররাতে কক্সবাজারে যায়। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নুরজাহান হোটেলের সামনে নামে।
পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে কক্সবাজার থেকে আসা একটি গাড়ি থেকে তাজমিনকে একা নামতে দেখা যায়। আশপাশের কয়েকটি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে মুঠোফোন হাতে ও কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে দেখা গেছে। বুধবার রাত ১২টা ১৯ মিনিটে পদুয়ার বাজারের নুরজাহান হোটেলের সামনে তাকে সর্বশেষ দেখা যায়। এরপর সে সড়কের দিকে চলে যায়। পরবর্তী গন্তব্যের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
বাবার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছিলেন লাইভ লোকেশন
তাজমিনের বাবা আবদুল আলিমের ভাষ্য, গভীর রাতে নিজের লাইভ লোকেশন হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে উদ্ধারের অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিল মেয়ে। তবে তিনি ঘুমিয়ে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বার্তাটি দেখতে পারেননি।
পরদিন সকালে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে অজ্ঞাতপরিচয় এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন স্বজনেরা। পরে তারা মরদেহটি তাজমিনের বলে শনাক্ত করেন।
নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলিমের মেয়ে। তার বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কুমিল্লা জেলায় কর্মরত। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকায় থাকত তাজমিন। ভুক্তভোগী নগরের ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির অনিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল।
