দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথমবারের মতো কক্ষপথে পৌঁছেছে ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি স্পেসএক্সের পরবর্তী প্রজন্মের রকেট স্টারশিপ। সোমবারের পরীক্ষামূলক যাত্রায় একটি প্রধান ইঞ্জিন নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে গেলেও প্রকৌশলীদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে বিপত্তি কাটিয়ে কক্ষপথে পৌঁছায় মহাকাশযানটি। কক্ষপথে পৌঁছানোর পর নতুন প্রজন্মের ২৬টি ভি-৩ স্টারলিংক স্যাটেলাইটও সফলভাবে মহাকাশে মোতায়েন করে স্টারশিপ।
স্পেসএক্সের টেক্সাসের ব্রাউনসভিলের কাছে মেক্সিকো উপসাগরের তীরবর্তী স্টারবেস কমপ্লেক্স থেকে সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে যাত্রা শুরু করে ৪০ তলা সমান উচ্চতার এই চালকবিহীন মহাকাশযান। এর নিচে ছিল সুপার হেভি বুস্টার এবং ওপরে মূল স্টারশিপ মহাকাশযান।
উড্ডয়নের পর সুপার হেভি বুস্টার স্টারশিপকে মহাকাশে পৌঁছে দেয়। পরে সেটি নিয়ন্ত্রিতভাবে ইঞ্জিন ব্যবহার করে নেমে মেক্সিকো উপসাগরের পানিতে অবতরণ করে। এর আগের দুটি অভিযানে বুস্টারটি কঠিন অবতরণের মুখে পড়েছিল।
তবে মূল মহাকাশযানটি মহাকাশে পৌঁছানোর পরই দেখা দেয় বিপত্তি। স্টারশিপের তিনটি প্রধান ইঞ্জিনের একটি নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যায়। তখন স্পেসএক্সের সরাসরি সম্প্রচারে কোম্পানির মুখপাত্র ড্যান হোয়াট জানান, মহাকাশযানটি কক্ষপথে পৌঁছাতে পারবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। প্রকৌশলীদের কাছ থেকে নতুন তথ্য পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে স্টারশিপকে কক্ষপথে তোলার জন্য আরও একটি ইঞ্জিন জ্বালানোর চেষ্টা করা হয়। সফলভাবে সেই ইঞ্জিন চালু হওয়ার পর কক্ষপথে পৌঁছে যায় স্টারশিপ।
এরপর শুরু হয় অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—স্টারলিংক স্যাটেলাইট মোতায়েন। প্রায় ২৬৯ কিলোমিটার উচ্চতায় একে একে ২৬টি নতুন প্রজন্মের স্টারলিংক স্যাটেলাইট মহাকাশে ছাড়ে স্টারশিপ।
স্টারশিপের জন্য এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ কেন?
কারণ কোনো নতুন রকেটের জন্য কক্ষপথে পৌঁছানো অন্যতম প্রধান পরীক্ষামূলক মাইলফলক। ২০২৩ সাল থেকে স্টারশিপের আগের ১৩টি পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন কক্ষপথে পৌঁছাতে পারেনি; সেগুলো মহাকাশের নিম্ন কক্ষপথের আগেই শেষ হয়েছে।
প্রায় এক দশকের উন্নয়ন প্রচেষ্টার পর অবশেষে কক্ষপথে পৌঁছানোর এই সাফল্য তাই স্পেসএক্সের জন্য বড় অগ্রগতি। এখন পর্যন্ত স্টারশিপ প্রকল্পে কোম্পানিটির ব্যয় ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
স্টারশিপকে ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন স্টারলিংক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য ব্যবহার করতে চায় স্পেসএক্স। একই সঙ্গে নাসার ভবিষ্যৎ চন্দ্রাভিযানেও এই মহাকাশযান ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
মহাকাশযানটি এবার প্রায় ১০ ঘণ্টার অভিযানে পৃথিবীকে ছয়বার প্রদক্ষিণ করার কথা রয়েছে। এরপর চিলির পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে মহাকাশযানটি।
স্টারশিপের কক্ষপথে পৌঁছানো অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই স্পেসএক্সের লক্ষ্য ছিল। ইলন মাস্ক একসময় ২০২২ সালেই এই সাফল্য অর্জনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। এরপর ২০২৩ সালে স্যাটেলাইট মোতায়েন শুরু করার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু একের পর এক পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সময়সীমা পিছিয়ে যায়।
এখন নতুন এই সাফল্যের পর স্টারশিপকে নিয়মিত ব্যবহারের দিকে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করতে পারবে স্পেসএক্স। কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য আরও বড়—প্রতিবছর শত শত, এমনকি হাজার হাজার স্টারশিপ উড্ডয়ন করা। মহাকাশ শিল্পে এমন উৎক্ষেপণ-গতি এখনও নজিরবিহীন।
তবে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের আগে স্টারশিপকে আরও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কারণ এবার কক্ষপথে পৌঁছানো এবং স্যাটেলাইট মোতায়েন সফল হলেও, একটি প্রধান ইঞ্জিনের হঠাত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে—এই বিশাল মহাকাশযানের প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার বিষয়।
তবু দীর্ঘ বিলম্ব ও একাধিক পরীক্ষামূলক ব্যর্থতার পর প্রথমবার কক্ষপথে পৌঁছানো স্পেসএক্সের স্টারশিপ কর্মসূচিতে একটি বড় অধ্যায়ের সূচনা করেছে।