জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে ট্রাম্পের করা কিছু মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর দাবি
- 0


প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৩ ২০২৬, ১৩:০৯
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে অস্ত্রের মজুত, তেল, মাদক চোরাচালান, কর্মসংস্থান, যুদ্ধ বন্ধ এবং বিনিয়োগ নিয়ে একাধিক দাবি করেছেন। তবে এসব দাবির কয়েকটি তথ্যের সঙ্গে মেলে না, আবার কিছু দাবি সঠিক হলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি’র ফ্যাক্ট-চেক। ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার নিউইয়র্কে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প এসবের অনেকগুলো দাবি তার দ্বিতীয় মেয়াদে আগেও করেছেন।
অস্ত্রের মজুত নিয়ে দাবি
ট্রাম্প দাবি করেন, অ্যামেরিকার কাছে এত বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে যে তা ব্যবহারের কথা কল্পনাও করা যায় না এবং নজিরবিহীন মাত্রায় নতুন অস্ত্র তৈরি হচ্ছে।
এ দাবির সঙ্গে সামরিক কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক তথ্য ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের মিল নেই। এপি জানিয়েছে, অ্যামেরিকার অস্ত্রের মজুত কমছে এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইল, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা পুনরায় পর্যাপ্ত মাত্রায় আনতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
আগস্টে অ্যামেরিকান কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ইউরোপে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ঘাটতি ‘অত্যন্ত সংকটজনক’ পর্যায়ে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে এসব অস্ত্র ব্যবহারের কারণে মজুত কমে যাওয়ায় ন্যাটোর দেশগুলো সম্ভাব্য রুশ হামলার ক্ষেত্রে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একজন অ্যামেরিকান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ন্যাটোর একজন কর্মকর্তাও ইউরোপে অ্যামেরিকা ও ন্যাটোর বাহিনীর কাছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কম থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ—সিএসআইএসের মে মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো অস্ত্র অ্যামেরিকার হাতে রয়েছে। কিন্তু মজুত কমে যাওয়ায় পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে ঝুঁকির একটি সময় তৈরি হয়েছে এবং অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে সময় লাগবে।
তেল নিয়ে ৬০ শতাংশের দাবি
ট্রাম্পের আরেক দাবি, অ্যামেরিকা ও ভেনেজুয়েলার তেল একসঙ্গে ধরলে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল তাদের হাতে রয়েছে।
এ হিসাবও সঠিক নয়। আগস্টের শেষ দিকে ঘোষিত এক চুক্তির মাধ্যমে অ্যামেরিকা ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে ১০০ বছরের অধিকার পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রের প্রমাণিত মজুত প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল। ভেনেজুয়েলার মোট অপরিশোধিত তেলের মজুত ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি বলে অনুমান করা হয়।
অন্যদিকে অ্যামেরিকার প্রমাণিত তেলের মজুত প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ব্যারেল। কিন্তু দুই দেশের মজুতের সর্বোচ্চ হিসাব একসঙ্গে ধরলেও বিশ্বের প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুতের মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ হয়—৬০ শতাংশ নয়।
এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার জ্বালানি অবকাঠামো দীর্ঘদিনের অবনতিতে রয়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
মাদক আটকের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন
ট্রাম্প দাবি করেছেন, অ্যামেরিকা কয়েক ডজন মাদকবাহী নৌযানে হামলা চালিয়ে সমুদ্রপথে আসা ৯৭ শতাংশ মাদক ধ্বংস করেছে।
কিন্তু এ সংখ্যার নির্ভরযোগ্য হিসাব করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ কত পরিমাণ মাদক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছেছে, তা নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব নয়।
এপ্রিল মাসে ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন, সমুদ্রপথে পাচার হওয়া ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ মাদক আটকানো হয়েছে। ওই দাবির উৎস জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস এপিকে অ্যামেরিকার কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের মাদক আটকের তথ্য দেখায়।
তবে ওই তথ্য ছিল নির্দিষ্ট সময়ের একটি পরিসংখ্যান। উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ জলসীমা-সংক্রান্ত অঞ্চলে মাদক আটকের পরিমাণ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জুলাইয়ের তুলনায় ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ কমেছিল। এটি মোট পাচার হওয়া মাদকের পরিমাণের হিসাব নয় এবং দুই মাসের তথ্য দিয়ে সামগ্রিক প্রবণতাও নির্ধারণ করা যায় না।
সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য অধ্যাপক দেসা বার্গেন-চিকো বলেন, মাদক আটকের তথ্য মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের পরিমাণ দেখায়; প্রকৃত মাদক পাচারের পরিমাণ নয়। কত মাদক ধরা পড়েনি, তা জানা যায় না।
কর্মসংস্থান নিয়ে দাবি
ট্রাম্প বলেছেন, অ্যামেরিকায় এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ কাজ করছেন।
এ দাবি মোটের ওপর সত্য হলেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। অ্যামেরিকার অর্থনীতিতে অধিকাংশ মাসেই নতুন কর্মসংস্থান যোগ হয়। ফলে মোট চাকরির সংখ্যা নিয়মিত নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। গত ৮০ বছরের মধ্যে ৬৫ বছরেই অ্যামেরিকায় কর্মসংস্থান বেড়েছে।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ১ মিলিয়নের বেশি নতুন বেসরকারি খাতের চাকরি তৈরি হয়েছে। এপি’র হিসাবে, তার দ্বিতীয় প্রশাসন শুরু হওয়ার পর অ্যামেরিকায় প্রায় ৮০৭ হাজার চাকরি যুক্ত হয়েছে—যা ১ মিলিয়নের কাছাকাছি হলেও ঐতিহাসিক মানদণ্ডে বিশেষ বড় বৃদ্ধি নয়।
‘আটটি যুদ্ধ’ শেষ করার দাবি
ট্রাম্প দাবি করেছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আটটি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন।
এপির ফ্যাক্ট-চেক বলছে, বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক বা মধ্যস্থতায় ট্রাম্পের ভূমিকা থাকলেও তার দাবির মতো সরাসরি যুদ্ধের অবসান ঘটানোর বিষয়টি স্পষ্ট নয়। অন্তত দুটি ঘটনায় তিনি যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব দাবি করেছেন, সেখানে শেষ করার মতো যুদ্ধই ছিল না। একই সময়ে অ্যামেরিকা ও ইরানের চলমান যুদ্ধ শুরু হয়েছে তার প্রশাসনের অধীনে।
২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ
ট্রাম্প জাতিসংঘে আরও দাবি করেছেন, তার প্রশাসন বিশ্বজুড়ে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেছে।
এ সংখ্যাটিকেও এপি অতিরঞ্জিত ও অত্যন্ত অনুমাননির্ভর হিসেবে উল্লেখ করেছে। হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তার পরিমাণ ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার—যা ট্রাম্পের দাবির প্রায় অর্ধেক। ওই হিসাবেও অ্যামেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ে করা কিছু বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প অ্যামেরিকার সামরিক সক্ষমতা, জ্বালানি সম্পদ, মাদকবিরোধী অভিযান ও অর্থনৈতিক অর্জনের ওপর জোর দিয়েছেন। কিন্তু এপি’র তথ্য যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান সরাসরি বিদ্যমান তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবার কিছু দাবি বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করলেও সেখানে সময়কাল, তুলনামূলক হিসাব বা প্রাসঙ্গিক তথ্য বাদ পড়েছে।
ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য মূল্যায়নে শুধু ঘোষিত সংখ্যা নয়, সেই সংখ্যার উৎস, সময়কাল এবং কোন সূচক দিয়ে তা মাপা হয়েছে—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
