মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপর্যয়
২০২৮-এর রাজনৈতিক মঞ্চে ট্রাম্প থেকে আলাদা পরিচয় গড়ার চেষ্টায় জেডি ভ্যান্স
- 0


প্রকাশিত: নভেম্বর ৮ ২০২৬, ১৬:৪১
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আলোচনায় নিজের অবস্থান সামনে আনছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। যে কারণে ট্রাম্পের নীতি থেকে প্রকাশ্যে দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করেছেন তিনি। নির্বাচনের আগে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে নিজের নীতিগত অগ্রাধিকারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। আর নির্বাচনের পর প্রকাশ্যে ইরান যুদ্ধকে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ইযরায়েলের সঙ্গে অ্যামেরিকার সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় আরও সামনে চলে এসেছেন ভ্যান্স।
কিন্তু প্রশ্ন—ট্রাম্পের প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েও তাঁর নীতির সমালোচনা করে ভ্যান্স কি নিজের জন্য আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে চাইছেন? নাকি রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের বিতর্কে নেতৃত্ব দিতে চাইছেন?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভ্যান্সের প্রচারণায় পরিবর্তনটি ছিল লক্ষণীয়। রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের রিপাবলিকান কনভেনশনের পর তাঁর দেওয়া ছয়টি বক্তৃতায় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা প্রশাসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের চেয়ে নিজের নীতিগত অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ইরান যুদ্ধ কিংবা অভিবাসী বহিষ্কারের মতো ট্রাম্পের প্রধান কর্মসূচিগুলো এড়িয়ে তিনি কথা বলেছেন অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, পররাষ্ট্রনীতিতে সংযম এবং জননিরাপত্তা নিয়ে। নির্বাচনের আগে এসব বিষয়কে সামনে রেখে রিপাবলিকানদের পক্ষে ভোট চেয়েছেন, খুব কমই উচ্চারণ করেছেন ট্রাম্পের নাম।
রয়টার্সকে কৌশলটির সঙ্গে পরিচিত দুজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, এই পরিবর্তন ছিল পরিকল্পিত। ভ্যান্স ও তাঁর উপদেষ্টারা মনে করেছেন, এসব বিষয়ে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কথা বলার মতো কর্তৃত্ব ও অভিজ্ঞতা রাখেন। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ম্যাগা আন্দোলনের অংশ হলেও এসব নীতির প্রধান প্রচারক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চাইছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ইযরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোরালো লবিংয়ের কারণে ট্রাম্প যেখানে ইরান যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং এখনও একে সমর্থন করে যাচ্ছেন, সেখানে ভ্যান্স দ্রুত এই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বুধবার সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে আরও সরাসরি অবস্থান নেন ভ্যান্স। তাঁর ভাষায়, “আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।” ২০২৬ সালের নির্বাচনে ২০২৪ সালে ট্রাম্প-ভ্যান্সকে ভোট দেওয়া অনেক সমর্থক কেন ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে গেছেন, তার চারটি কারণ তুলে ধরেন তিনি। ইরান যুদ্ধ শেষ করা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিতে গুরুত্ব দেওয়া, অ্যামেরিকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ইযরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পরিবর্তন—এই চারটি বিষয়কে ভোটারদের অসন্তোষের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেন।
ভ্যান্স শুধু যুদ্ধের সমালোচনা করেননি; দ্রুত সংঘাত শেষ করার আহ্বানও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, রিপাবলিকানদের সামনে এগোতে হলে বিদেশনীতি নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই বক্তব্যে ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। কারণ প্রেসিডেন্ট দীর্ঘদিন ধরে ইরান যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে আসছেন। নির্বাচনে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব স্বীকার করলেও বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, তিনি সিদ্ধান্তটি অন্যভাবে নিতেন না।
তবে ভ্যান্সের এই অবস্থানকে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বিচ্ছেদ হিসেবে দেখছেন না হোয়াইট হাউস ও তাঁর যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা। তাঁদের দাবি, পোস্টটি দেওয়ার বিষয়ে চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস আগে থেকেই জানতেন। ট্রাম্পও ভ্যান্সের বক্তব্য সম্পর্কে নিজের ধারণার কথা জানিয়ে বলেছেন, তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের অবস্থান বোঝেন। প্রেসিডেন্টের বড় ছেলে ডনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রসহ কয়েকজন রক্ষণশীল রাজনীতিকও ভ্যান্সের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অর্থাৎ মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এলেও প্রশাসনের ভেতরে তাৎক্ষণিক ভাঙনের প্রমাণ নেই।
তবু ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আলোচনায় এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। রিপাবলিকানদের মধ্যে ভ্যান্সকে সম্ভাব্য শীর্ষ প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু তিনি এখনো প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি, আর ট্রাম্পও তাঁকে কিংবা অন্য কাউকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেননি। ফলে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে গিয়ে তাঁকে একদিকে ট্রাম্পের শক্তিশালী ভোটার জোট ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে বর্তমান প্রশাসনের যেসব সিদ্ধান্ত ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছে, সেগুলো থেকে দূরত্বও তৈরি করতে হবে।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ মাইকেল রিচির মতে, ভ্যান্স শুধু ট্রাম্পের থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করছেন—এভাবে বিষয়টি দেখলে ভুল হবে। ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পাওয়া রাজনৈতিক মঞ্চ ব্যবহার করে তিনি দলের ভবিষ্যৎ বিতর্কের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করতে চাইছেন। তবে ভ্যান্সের নিজের রাজনৈতিক ব্র্যান্ডও নির্বাচনে অক্ষত থাকেনি। তিনি যেসব স্টেইটে প্রচারে গিয়েছেন, সেখানেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা হেরেছেন। ওহাইওর গভর্নর প্রার্থী বিবেক রামস্বামীর প্রচারণায় সমর্থন দেওয়া একটি বিতর্কিত বিজ্ঞাপনও ভোটের ফলকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভ্যান্সের পাশাপাশি রিপাবলিকানদের অন্য সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরাও পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করছেন। টেক্সাসের সেনেটর টেড ক্রুজ মনে করেন, রিপাবলিকান পার্টি নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্নে যথেষ্ট কাজ করেনি। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের মতে, প্রার্থীরা ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগের বদলে ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন; উপেক্ষিত থেকেছে ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জনমত। স্টেইট সেক্রেটারি মার্কো রুবিও এখনো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নেননি।
তবে ভ্যান্সের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রিপাবলিকান প্রাইমারিতে সমর্থন পাওয়া নয়। সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হতে হলে তাঁকে ট্রাম্পের উত্তরাধিকার এবং নিজের স্বতন্ত্র অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। ডেমোক্র্যাটরা ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা ২০২৮ সালের নির্বাচনে ভ্যান্সকে ট্রাম্পের ব্যর্থতার সাথেই যুক্ত করার কৌশল নিতে যাচ্ছে।
অতএব, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ভ্যান্সের বক্তব্য ও প্রচারণার ধরনকে ২০২৮-এর রাজনীতির প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে এখন দেখার বিষয়, হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ পদ থেকে সুজি ওয়াইলসকে সরিয়ে ট্রাম্প যখন তার কট্টরপন্থি নীতিতে আরও জোরালোভাবে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তখন জেডি ভ্যান্স ভাইস প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দলের আগামী দিনের নেতৃত্ব কতটা নিজের অনুকূলে আনতে পারেন।
