দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যার এক বছর
রেড ক্রিসেন্ট ও আইএফআরসির সহায়তায় ঘুরে দাঁড়াল তিন লক্ষাধিক মানুষ

টিবিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২১ ২০২৫, ০:০০ হালনাগাদ: নভেম্বর ৭ ২০২৫, ১২:৪৪

টেকসই জীবনযাপন নিশ্চিতে প্রায় এক হাজার ১০০ পরিবারের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছবি: বিডিআরসিএস

টেকসই জীবনযাপন নিশ্চিতে প্রায় এক হাজার ১০০ পরিবারের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছবি: বিডিআরসিএস

  • 0

বন্যার প্রথম দিন থেকেই রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীরা বন্যাকবলিত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে উদ্ধার কর্মসূচির পাশাপাশি জরুরি খাবার পানি, খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তা পৌঁছে দেন। এর বাইরে এক হাজারেরও বেশি পরিবারের বাড়ি মেরামত ও পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি দেড় হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার এক বছর পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তিন জেলা নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের তিন লাখ দুই হাজারের বেশি মানুষ।

আকস্মিক ছন্দপতনের পর নতুন করে জীবন শুরু করতে তাদের সহায়তা করেছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস), ইন্টারন্যাশনাল রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) ও সহযোগীরা।

সংস্থাগুলোর সহায়তায় চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত জীবিকা, গৃহায়ণ, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে এ অঞ্চলের হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবিকা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক উন্নয়নসহ জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা হয়েছে।

বাড়ি মেরামত ও টয়লেট নির্মাণ

বন্যার প্রথম দিন থেকেই রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীরা বন্যাকবলিত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে উদ্ধার কর্মসূচির পাশাপাশি জরুরি খাবার পানি, খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তা পৌঁছে দেন। এর বাইরে এক হাজারেরও বেশি পরিবারের বাড়ি মেরামত ও পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি দেড় হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে।

টেকসই জীবনযাপন নিশ্চিতে প্রায় এক হাজার ১০০ পরিবারের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়াও বন্যাকালীন জরুরি সহায়তার অংশ হিসেবে ৪৭ হাজার ৪৯২টি পরিবারকে ছয় হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিবারকে দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত নগদ সহায়তা।

চারা ও বীজ বিতরণ

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সবুজায়নের লক্ষ্যে স্থানীয়দের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে বিভিন্ন গাছের এক লাখেরও বেশি চারা ও ১৪ হাজার প্যাকেট শাকসবজির বীজ।

নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে ১৫টি মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র পুনর্নির্মাণ, ওষুধ ও মেডিক্যাল সরঞ্জাম প্রদান করা হয়েছে।

এ ছাড়া নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৬৭০টি টিউবওয়েল মেরামত ও নতুন করে স্থাপন করা হয়েছে।

সুফলভোগীর ভাষ্য

বন্যায় সর্বস্ব হারিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হয়েছিলেন নোয়াখালীর রুবিনা খানম। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করে রেড ক্রিসেন্ট।

‘বন্যায় আমার ঘরবাড়ি সব ভাইসা গেছিল। পানি বেশি থাকায় পরিবার নিয়া আমরা রাস্তায় উঠি। আমার স্বামী অসুস্থ; কাজ করতে পারেন না। তিন বাচ্চার মধ্যে দুজন প্রতিবন্ধী। রেড ক্রিসেন্টের সহায়তায় আমি বাড়ি তৈরি করছি, পায়খানা বানাইছি’, বলেন রুবিনা খানম।

‘জীবিকার জন্য যে টাকা পাইছি আমরা, তা দিয়া আমার বড় পোলা বাজারে মাছ বিক্রি কইরা উপার্জন করে। এখন আর আমার ভিক্ষায় যাওয়া লাগে না। বাচ্চাগুলোর জন্য ওষুধ কিনতে পারি। তিন বেলা খাইতে পারি’, যোগ করেন এ নারী।

‘হাজারো বন্যার্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি’

বন্যার্তদের সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের মহাসচিব ড. কবির এম. আশরাফ আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি যেকোনো দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকে। আইএফআরসি ও অন্যান্য পার্টনারদের সহায়তায় আমরা হাজারো বন্যার্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি। তাদের জীবন পুনর্গঠনে সাথে থাকতে পেরেছি।

‘আমাদের ভলান্টিয়ার ও কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।’

আইএফআরসি বাংলাদেশের হেড অব ডেলিগেশন আলবার্টো বোকানেগ্রা বলেন, ‘বন্যার্ত মানুষের দৃঢ়তা ও সাহস সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক। আমরা বাংলাদেশের দুর্যোগ প্রস্তুতি ও সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সবসময় পাশে আছি, যেন ভবিষ্যৎ যেকোনো সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানুষ আরও সক্ষম হয়।’

এর আগে বন্যার সময় জরুরিভিত্তিতে আইএফআরসি ও রেড ক্রিসেন্ট বন্যার্তদের মাঝে ৫ লাখ ৬৯ হাজার লিটার নিরাপদ খাবার পানি, দুই লাখ ৪৮ হাজার ৭০০ পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, প্রায় ৭০ হাজার মানুষের জন্য রান্না করা খাবার এবং ৬০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

এ ছাড়াও ওই সময় ১৬টি মোবাইল মেডিক্যাল টিম ২৭ হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে এবং তিন হাজার ৬৮১ জনকে মানসিক সেবা প্রদান করেছে।

রোগ সংক্রমণ রোধে এক লাখ ৫৫ হাজার প্যাকেট ওরাল স্যালাইন ও ডেঙ্গু জ্বর পরীক্ষার ১৮ হাজার কিট বিতরণ করা হয়েছে।

গত বছরের আগস্টের বন্যায় ১১ জেলার প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রাকৃতিক এ দুর্যোগে ৭৪ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়।