নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য কাঠামোয় ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক ছাড় বিবেচনায় চীন-অ্যামেরিকা
- 0


প্রকাশিত: মে ১৩ ২০২৬, ১৫:২৩ হালনাগাদ: মে ১৩ ২০২৬, ১৭:১০
দীর্ঘদিনের বাণিজ্য উত্তেজনা কমাতে নতুন অর্থনৈতিক সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে অ্যামেরিকা ও চীন। দুই দেশ মুক্তবাজারের স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে গিয়ে এমন একটি “পরিচালিত বাণিজ্য কাঠামো” তৈরির আলোচনা করছে, যার আওতায় প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে পারস্পরিক শুল্ক কমানো হতে পারে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে এই পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে আসছে। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থাকে “বোর্ড অব ট্রেড” নামে উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রথম মার্চ মাসে উত্থাপন করেন অ্যামেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—ওয়াশিংটন আর বেইজিংকে তাদের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামো বদলাতে চাপ দিচ্ছে না। অতীতে অ্যামেরিকা চেয়েছিল, চীন যেন বাজারনির্ভর ও ভোক্তাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক মডেলের দিকে যায়। কিন্তু এখন ট্রাম্প প্রশাসন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে সীমিত খাতে বাস্তব বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর জোর দিচ্ছে।
জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, “আমরা চীনকে তাদের অর্থনীতি পরিচালনার ধরন বদলাতে বাধ্য করতে যাচ্ছি না। বরং আমরা খুঁজছি—কোন জায়গাগুলোতে দুই দেশের বাণিজ্য আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা সম্ভব।”
তিনি এই ব্যবস্থাকে একটি “অ্যাডাপ্টার”-এর সঙ্গে তুলনা করেন, যা ভিন্নধর্মী দুই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
বেইজিং বৈঠকের আগে সাউথ কোরিয়ার ইনচনে বৈঠক করেন অ্যামেরিকার ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এবং চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী হি লিফেং। প্রায় তিন ঘণ্টার ওই বৈঠকে ট্রাম্প ও শি’র আলোচনার জন্য অর্থনৈতিক প্রস্তাবগুলোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে বৈঠক শেষে দুই পক্ষ আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ধাপে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা কমানোর একটি কাঠামো গড়ে তোলা হতে পারে। যদিও এখনো নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক এশিয়া সোসাইটি পলিসি সেন্টারের প্রধান এবং সাবেক বাণিজ্য আলোচক ওয়েন্ডি কাটলার বলেন, দুই পক্ষ এখন ৩০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের একটি “অসংবেদনশীল বাণিজ্য তালিকা” তৈরির দিকে এগোচ্ছে।
এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে জ্বালানি ও কৃষিপণ্য। অ্যামেরিকা চায়, চীনের বাজারে তাদের জ্বালানি ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়ুক। বর্তমানে চীন অ্যামেরিকান অপরিশোধিত জ্বালানিতে ১০ শতাংশ, তরল প্রাকৃতিক গ্যাসে ১৫ শতাংশ এবং গরুর মাংসে সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করে রেখেছে।
অন্যদিকে অ্যামেরিকাও চীনের বহু ভোক্তা পণ্যের ওপর ২০১৯ সালে আরোপিত শুল্ক বহাল রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে টেলিভিশন, ব্লুটুথ হেডফোন, স্মার্ট স্পিকার, জুতা এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন কাঠামো মূলত কৌশলগত প্রযুক্তি খাতকে আলাদা রেখে সীমিত পরিসরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের প্রতিযোগিতা এখনো তীব্র।
দুই দেশ “বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট” নামে আরেকটি বিনিয়োগ কাঠামো নিয়েও আলোচনা করতে পারে। তবে গ্রিয়ার স্পষ্ট করে বলেছেন, এখনো বড় আকারের পারস্পরিক বিনিয়োগ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করার মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি দুই দেশ।
এদিকে অ্যামেরিকার আইনপ্রণেতা ও শিল্পখাতের বিভিন্ন সংগঠন ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে বলে—চীনা বিনিয়োগের জন্য দরজা খুলে দিলে তা অ্যামেরিকার উৎপাদনশিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প-শি বৈঠক শুধু দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে,
এই নতুন কাঠামো সফল হলে কয়েক বছরের উত্তেজনার পর অ্যামেরিকা-চীনর অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।
