ওয়েস্ট ব্যাংকে ফিলিস্তিনিদের বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের সময় হামলা চালিয়েছেন ইযরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কয়েক ডজন বসতি স্থাপনকারী জলপাই বাগানে আগুন দেয়ার পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়েছে তারা। শুক্রবারের (১৬ অক্টোবর) রামাল্লার উত্তরের খিরবেত আবুল ফালাহ গ্রামে এই সহিংসতায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর এক আলোকচিত্রী সাংবাদিক রয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় ৮০ জন ইযরায়েলি বসতি স্থাপনকারী আবু ফালাহ গ্রামের একটি জলপাই বাগানে হামলা চালান। তাদের কয়েকজনের হাতে গ্যাসের ক্যানিস্টার ছিল। এ সময় তাঁরা ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে গুলতি দিয়ে পাথর ছোড়েন। আত্মরক্ষায় ফিলিস্তিনিরাও পাথর ছুড়লে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ৪২ বছর বয়সী কৃষক মুতাজ আবদেলহাদি বলেন, ‘বসতি স্থাপনকারীরা আমাদের ওপর হামলা চালাতে এবং বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করতে চায়।’ ফিলিস্তিনি চিকিৎসাকর্মীরা জানান, হামলায় আহত দুজনকে রামাল্লার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় সংবাদ কভার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর ফটোসাংবাদিক হাইডি লেভিন। গুরুতর আহত হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হামলাকারীদের দানব অভিহিত করে ইযরায়েলি অভিভাবকদের প্রতি সন্তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
লেভিন বলেন, ‘আমি জানি না, মা-বাবা সন্তানদের কীভাবে এমন দানব বানিয়ে গড়ে তোলে। প্যালেস্টিনিয়ানদের ওপর ওদের নৃশংসতার ধরন আমি নিজের চোখে দেখেছি। ওরা চরমপন্থী ইহুদি সন্ত্রাসী, পুরো ইযরায়েলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। আর সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এর জন্য তাদের কাউকে কখনোই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না—এ বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত।’
লেভিন জানান, অন্তত ৫০ বার তাকে আঘাত করা হয়েছে। উপর্যপুরি লাথির আঘাতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজের প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা জানান তিনি। বলেন, ‘আমাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়া হয়। ভাগ্যিস হেলমেট ও ফ্ল্যাক জ্যাকেট পরা ছিলো, তা না হলে হয়তো আজ আমি এখানে বেঁচে থাকতাম না। মাটিতে ফেলে তারা বারবার আমাকে লাথি মারছিল, অন্তত ৫০ বারের মতো আমাকে নির্মমভাবে আঘাত করা হয়।’
হামলার একপর্যায়ে ইযরায়েলি সামরিক বাহিনীর অন্তত দুটি জিপ ঘটনাস্থল অতিক্রম করে। পরে সেনারা ফিলিস্তিনিদের দিকে কাঁদানে গ্যাস ছোড়েন। এ সময় গুলির শব্দ শোনা যায়। রয়টার্সের এক আলোকচিত্রী অন্তত একজন সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীকে গুলি ছুড়তে দেখেছেন। এ বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইযরায়েলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন ইয়েশ দিনের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরুর কাছাকাছি ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ওয়েস্ট ব্যাংকে ফিলিস্তিনিদের ওপর অন্তত ১৭০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ইযরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকারের আমলে ওয়েস্ট ব্যাংকে ইযরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ বেড়েছে। নেতানিয়াহু সহিংসতার সমালোচনা করলেও তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা রয়েছে।
ওয়েস্ট ব্যাংকে প্রায় পাঁচ লাখ ইযরায়েলি বসতি স্থাপনকারী এবং অন্তত ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও অধিকাংশ দেশ আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এসব বসতিকে অবৈধ বলে বিবেচনা করে। তবে ইযরায়েল এ অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে অঞ্চলটিকে বিতর্কিত এলাকা হিসেবে বর্ণনা করে।
এর আগে শুক্রবার সকালে তুরমুস আয়া গ্রামের কাছেও জলপাই সংগ্রহরত কৃষকদের ওপর হামলা চালিয়ে তিনটি গাড়িতে আগুন দেন বসতি স্থাপনকারীরা। ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সালাহ আবু নিসওয়া জানান, হামলাকারীরা এক ব্যক্তিকে একা পেয়ে মারধর করেন। তবে এ ঘটনায় ইযরায়েলি সামরিক বাহিনীর তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।