


প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০ ২০২৬, ১৪:২১ হালনাগাদ: সেপ্টেম্বর ৩০ ২০২৬, ১৪:৩৫

বাগদাদে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর আনন্দসূচক শোভাযাত্রা। ছবি: রয়টার্স
দুই দশকের বেশি সময় পর ইরাক থেকে চূড়ান্তভাবে সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে অ্যামেরিকান নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সামরিক জোট। বুধবার বাগদাদ ও পেন্টাগন যৌথভাবে ইরাক থেকে ইউএস সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এ উপলক্ষ্যে ৩০ সেপ্টেম্বরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সার্বভৌমত্ব দিবস’ ও জোটের সামরিক মিশন সমাপ্তির দিন হিসেবে ঘোষণা করেছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী ফালেহ আল-জাইদি। জাইদি বলেন, বহু ত্যাগের বিনিময়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইরাক।
এদিন বাগদাদে বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অ্যামেরিকান নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটকে বিদায় জানানো হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী জাইদিসহ দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার হাইবাত আল হালাবুসি ও অন্যান্য শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা অংশ নেন।
২০০৩ সালে ইউএস আক্রমণের পর দীর্ঘ সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী পর্বের অবসানকে ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন বাগদাদের বাসিন্দারা। তবে বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পর তৈরি হওয়া নিরাপত্তা শূন্যতার সুযোগে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের প্রভাব বৃদ্ধি এবং জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেইটের পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর আশঙ্কায় উদ্বেগও জানিয়েছেন সাধারণ ইরাকিরা।
তবে সুদীর্ঘ ২৩ বছর পর দুই দশকের অ্যামেরিকান সামরিক উপস্থিতির অবসান উদযাপনে রাজপথে নেমে আসে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ মানুষ। বাগদাদ থেকে নাজাফ জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজ করে ইরানি বাহিনী। এদিন ইরাকি কুর্দিস্তানের কিরকুক অঞ্চলেও ব্যাপক সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নেয় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।
২০০৩ সালে দেশটির প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতে যে অভিযান শুরু হয়েছিল, ইরাকে সেটাই পরিণত হয় দুই দশকের অন্যতম রক্তাক্ত অধ্যায়ে। সাড়ে চার হাজারের বেশি অ্যামেরিকান সেনা এবং প্রায় ২০০ হাজারের বেশি ইরাকি বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে এই সংঘাতে। ২০১১ সালে একবার ইউএস সেনা ফিরে গেলেও ২০১৪ সালে আইএস’র উত্থানের মুখে আবারো তাদের ইরাকের ভূমিতে ফিরতে হয়েছিল।

দীর্ঘ সময় পর নিজ দেশের ভূখণ্ড থেকে বিদেশি সেনা প্রত্যাহারকে সাধারণ ইরাকিরা তাদের বিজয় হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নিজেদের দেশ নিজেদেরই শাসন করা উচিত। তবে একইসাথে আইসিসসহ অন্যান্য সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীর উত্থানের আশঙ্কাও করছেন অনেকে।
সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও ইউএস সেনা প্রত্যাহারে সংশয় জানিয়েছেন। তবে বাগদাদ বলছে, তাদের নিরাপত্তা বাহিনী নিজ দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় পূর্ণ প্রস্তুতিতে রয়েছে।
দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী আল-মুয়াল্লিম এর মতে, এই সিদ্ধান্ত ইরাকের জাতীয় সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করবে। তবে ইরানি সামরিক ও বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ইউএস বাহিনীর উন্নত প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতার অভাবে নিরাপত্তা ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘মূল চ্যালেঞ্জগুলো হলো—জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম বা সক্ষমতা এখনো ইরাকের নেই। এর মধ্যে এয়ার কভার (আকাশপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থা) এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন রয়েছে, তেমনি কারিগরি ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রেও সামরিক সক্ষমতা এখনো উচ্চপর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি, মাঝে মাঝেই ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন উপত্যকায় আইএস গোষ্ঠী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে এবং কিছু সামরিক অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে।’
এটি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা অস্থিতিশীলতা এবং ইরাকের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেও ব্যাহত করতে পারে বলে সংশয় জানান এই ইরাকি বিশ্লেষক।
তবে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র, মেজর জেনারেল তাহসিন আল-খাফাজি বলেছেন, ভিন্ন কথা। তার মতে, ইরাক এখন নিজ দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পূর্ণ প্রস্তুত। তাদের বাহিনীও পূর্ণ সক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জন করেছে। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে আইএসকে পরাজিত করার পর থেকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে আমরা আমাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছি। আমাদের বাহিনী দেশের সীমানা রক্ষা করতে এবং কঠিন ভূখণ্ডেও সন্ত্রাসী আস্তানায় আঘাত হানতে সক্ষম।’
ইরাকি এই সামরিক কর্মকর্তার দাবি, বর্তমানের দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম এবং রাডার দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। বাগদাদ এখন নিজেদের আকাশসীমা ভূখণ্ড সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করেছে।

বাগদাদের রাস্তায় ইউএস সেনা প্রত্যাহারে আনন্দ ছড়িয়ে পড়লেও উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে বিরাজ করছে গভীর শঙ্কা। তবে পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে, মিশন শেষ হলেও ইরাকি বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে যাবে তারা।
