কুয়েতে ইরানি হামলা ও হরমুজের কাছে অ্যামেরিকান আঘাত; মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বেড়েছে উত্তেজনা
- 0


প্রকাশিত: জুন ৩ ২০২৬, ১৭:০৪
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনায় কুটনৈতিক অগ্রগতির মাঝে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কুয়েতের বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি দক্ষিণ ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালিয়েছে অ্যামেরিকা। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত এখনো স্থায়ী সমাধান থেকে অনেক দূরে।
বুধবার কুয়েতের কর্তৃপক্ষ জানায়, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কিছু স্থাপনা এবং কূটনৈতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং ৬৩ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হলেও পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে কুয়েত এয়ারওয়েজ এবং জাজিরা এয়ারওয়েজ তাদের ফ্লাইট কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে।
এর আগে ইরানি গণমাধ্যম দাবি করে, দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী বাহরাইনে অবস্থানরত অ্যামেরিকান পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, একটি অ্যামেরিকান বিমানঘাঁটি এবং একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে অ্যামেরিকান সেন্ট্রাল কমান্ড—সেন্টকম—এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলছে, ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়েছে।
পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সেন্টকম দক্ষিণ ইরানে নতুন দফা ‘প্রতিরক্ষামূলক হামলা’ চালানোর কথা জানায়। তাদের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, সমুদ্রে মাইন স্থাপনে প্রস্তুত নৌযান এবং হরমুজ প্রণালীর কাছে কেশম দ্বীপের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। অ্যামেরিকার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের নতুন হামলার চেষ্টার জবাব হিসেবেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে অ্যামেরিকা ও ইসরাইলের হামলার পর শুরু হওয়া এই যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালীর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। চলমান অচলাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আবারও বেড়েছে। বুধবার তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বারবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত সপ্তাহে অ্যামেরিকা ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। প্রস্তাবিত সমঝোতার মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া। তবে পরবর্তী ধাপের জটিল আলোচনা এখনো বাকি রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই বলেছেন, আলোচনা বা যুদ্ধবিরতির কোনো ব্যবস্থাতেই ইরান অ্যামেরিকাকে ‘সীমা অতিক্রম’ করতে দেবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন কোনো আগ্রাসনের জবাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যাপক হামলা চালানো হবে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ কুয়েত ও বাহরাইনের ওপর হামলাকে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সমন্বিত ও কঠোর প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে সংঘাতের আরেকটি বড় ক্ষেত্র লেবাননেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। বৈরুতের কাছেও একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। আংশিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এটি বৈরুতের সবচেয়ে নিকটবর্তী হামলাগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে।
নিজের পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, লেবাননে চলমান সংঘাত নিয়ে ফোনালাপের সময় তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুকে “উন্মাদ বলে অভিহিত করেছিলেন।
বৃহত্তর যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চলাকালে দুই নেতার মধ্যে হওয়া ওই ফোনালাপে তীব্র ভাষা ও অশালীন শব্দও ব্যবহৃত হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সংক্ষিপ্ত নাম উল্লেখ করে জানান, “আমি তাকে বলেছিলাম—বিবি, আমাদের এটা থামাতে হবে, আমাদের এটা থামাতেই হবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইরান, অ্যামেরিকা, ইসরাইল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে। আর হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে আরও গভীরভাবে পড়তে পারে।
