অ্যামেরিকার হামলার আশঙ্কায় লোহিত সাগরের জলপথ বন্ধে হুথিদের প্রস্তুত থাকতে বলেছে ইরান
- 0


প্রকাশিত: জুলাই ১৬ ২০২৬, ১৩:১০
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকট আরও তিব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে অ্যামেরিকা হামলা চালালে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের প্রস্তুতি নিতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীকে নির্দেশ দিয়েছে তেহরান। বৃহস্পতিবার একাধিক ইরানি ও আঞ্চলিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ইতোমধ্যেই অচল হয়ে পড়ার পর যদি বাব এল-মান্দেবও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান জ্বালানি রপ্তানি পথই একসঙ্গে বিপর্যস্ত হবে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে।
রয়টার্সের তিনটি সূত্রের দাবি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্তের বার্তা ইতোমধ্যে হুথিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে নির্দেশনা ঠিক কীভাবে পাঠানো হয়েছে বা এটি অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মঙ্গলবার দেওয়া হুমকির আগে না পরে—সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প মঙ্গলবার ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন।
এদিকে হুথিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, গোষ্ঠীটি ইতোমধ্যে সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ইয়েমেনের হোদেইদাহ উপকূল, এডেন উপসাগর এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। এখন শুধু চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষা। একই সূত্রের দাবি, ইয়েমেনে এরিমধ্যে অবস্থান করছেন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি’র প্রতিনিধিরা। তারাই নির্ধারন করবেন কখন এই বাব এল মান্দেবে জাহাজ চলাচল বন্ধ করা হবে।
বর্তমান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের দুই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ফেব্রুয়ারিতে অ্যামেরিকা ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। এরপর সৌদি আরব তাদের পাইপলাইনের মাধ্যমে তেলের বড় অংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে সরিয়ে নিতে শুরু করে। বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ লোহিত সাগর হয়ে পরিবাহিত হচ্ছে। ফলে বাব এল-মান্দেবও অচল হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিকল্প জ্বালানি রপ্তানির পথও কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।
এই আশঙ্কা আরও বেড়েছে, কারণ সোমবার চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুথিরা। তাদের অভিযোগ ছিল, সৌদি আরব হুথি-নিয়ন্ত্রিত সানা বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা শুধু সৌদি-হুথি সংঘাতের পুনরুত্থান নয়, বরং ইরানের আঞ্চলিক কৌশলের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক টরবযর্ন সলভেড্ বলেছেন, হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, লড়াই যদি লোহিত সাগরের জ্বালানি অবকাঠামো বা বাণিজ্যিক জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির একমাত্র বড় বিকল্প পথটিও হুমকির মুখে পড়বে।
রিয়াদের ঘনিষ্ঠ দুটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব ইরান ও হুথিদের এই হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তাদের ধারণা, লোহিত সাগরকে কেন্দ্র করে এখন হুথি গোষ্ঠী আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ঘনিষ্ঠভাবে তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের কৌশল শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিকও। একটি আঞ্চলিক সূত্রের ভাষায়, ইরান বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়ে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়। কারণ, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—এই দুটি পথ একসঙ্গে অচল হলে শুধু তেলের দামই নয়, সার, ভোগ্যপণ্য ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যয়ও নতুন করে বেড়ে যেতে পারে।
হুথিরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। তবে অ্যামেরিকার অভিযোগ, বহু বছর ধরেই ইরান তাদের অস্ত্র, অর্থ ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। তেহরান অবশ্য সেই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রেও পরিণত হচ্ছে। হরমুজের পর যদি বাব এল-মান্দেবেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নতুন এক সংকটের মুখে পড়তে পারে।
