ওমানের কাছে জাহাজে হামলার পর হরমুজের ওপর কতৃত্বের দাবি পুনর্ব্যক্ত করলো ইরান

টিবিএন ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২৬ ২০২৬, ১৪:২৬
- 0
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের ভূমিকা উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অস্পষ্ট ব্যবস্থা, বিকল্প নৌপথ কিংবা ইরানকে পাশ কাটিয়ে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই কৌশলগত জলপথে নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না।
হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে আবারো দাবি তুলেছে ইরান। একই সঙ্গে অ্যামেরিকার পক্ষ নেওয়া থেকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে তেহরান। ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার একদিন পর শুক্রবার ইরানের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে সদ্য হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের ভূমিকা উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, অস্পষ্ট ব্যবস্থা, বিকল্প নৌপথ কিংবা ইরানকে পাশ কাটিয়ে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই কৌশলগত জলপথে নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না।
এর আগে অ্যামেরিকার স্টেইট সেক্রেটারি মার্কো রুবিও এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি-এর সদস্য দেশগুলো এক যৌথ বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের টোল, নিয়ন্ত্রণ বা চলাচলে বাধা ছাড়াই অবাধ নৌপরিবহনের আহ্বান জানিয়েছিল। পাশাপাশি তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ড্রোন সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়টিও ভবিষ্যৎ শান্তি চুক্তির অংশ করার দাবি জানায়। ইরান ওই বিবৃতিকে “হস্তক্ষেপমূলক, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং উসকানিমূলক” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি’র সতর্কবার্তার পর অনুমোদনহীন পথে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা তিনটি বিদেশি তেলবাহী জাহাজ ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে ওমান উপকূলের কাছে বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী এভার লাভলি নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ অজ্ঞাত একটি বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজটির পরিচালনাকারী তাইওয়ানের এভারগ্রিন মেরিন জানিয়েছে, কেউ হতাহত হয়নি এবং পরে জাহাজটি নিরাপদে যাত্রা অব্যাহত রাখে। তবে অ্যামেরিকার দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, জাহাজটির ওপর ইরান গুলি ছুড়েছিল। যদিও তেহরান সরাসরি এ অভিযোগের কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ইরানের পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনুমোদিত নৌপথ ব্যবহার না করলে তার দায় জাহাজের মালিক, পরিচালনাকারী ও ক্যাপ্টেনকেই বহন করতে হবে।
অন্যদিকে মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে তা বড় ধরনের সংকট তৈরি করবে। এ মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে প্রণালীটি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে শুক্রবার বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানি টার্মিনাল সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে প্রায় চার মাস পর আবারও অপরিশোধিত তেল লোডিং শুরু হয়েছে। শিপিং তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় শিপিং প্রতিষ্ঠান বাহরির নিয়ন্ত্রিত দুটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার বা ভিএলসিসি সেখানে তেল বোঝাই করেছে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব।
এদিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা -আইএমও এবং ওমান, যুদ্ধের কারণে আটকে পড়া শত শত জাহাজ সরিয়ে নিতে হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণে একটি নতুন নৌপথ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এই পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে তেহরান।
সাউথ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং জানিয়েছেন, সপ্তাহান্তে দেশটির তিনটি জাহাজ হরমুজ প্রণালী ত্যাগ করবে। এছাড়া আরও আটটি সাউথ কোরীয় জাহাজ ইতোমধ্যে নিরাপদে ওই জলপথ অতিক্রম করেছে।
তবে হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধই একমাত্র অমীমাংসিত বিষয় নয়। অ্যামেরিকা-ইরানের মধ্যে চলমান ৬০ দিনের আলোচনায় এখনও পারমাণবিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, আর্থিক প্রণোদনা এবং লেবাননে ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে ওয়াশিংটন, তেহরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান এখনো অনেক দূরে। ফলে বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম।

