চীনের কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রে আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করছে ইরান
- 0


প্রকাশিত: জুলাই ২৯ ২০২৬, ১৬:৫১
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরান তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে চায়নার তৈরি ৩০০ থেকে ৪০০টি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কিনছে। চুক্তি-সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম চালান ইরানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলারের এই চুক্তিকে অ্যামেরিকা ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে তেহরানের সবচেয়ে বড় স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারের উদ্যোগগুলোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতার একটি বড় দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় অ্যামেরিকা ও ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত অবকাঠামো রক্ষা করা কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে। জবাবে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালেও নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় চায়নার তৈরি QW-12 এবং FN-16 মডেলের কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনা হচ্ছে। এসব অস্ত্র নিম্ন উচ্চতায় উড়তে থাকা যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার এবং ড্রোন লক্ষ্য করে হামলা চালাতে সক্ষম। ছোট দল দ্রুত এগুলো মোতায়েন করতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্থান পরিবর্তনও করতে পারে। ফলে স্থায়ী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারির তুলনায় এগুলোকে ধ্বংস করা তুলনামূলক কঠিন।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, হংকংভিত্তিক জংকুইং বাওসাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চায়নার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করেছে। যদিও চায়নার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের চুক্তির খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। বেইজিংয়ের ভাষ্য, সংঘাতের অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাই চায়নার নীতি। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
চুক্তি সম্পন্ন হলেও সরবরাহের সময়সূচি, চূড়ান্ত সংখ্যা কিংবা বাস্তবায়নের অন্যান্য বিষয় এখনো পরিবর্তিত হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দফায় পশ্চিম চায়নার উরুমকি থেকে চালান পাঠানো হবে। এরপর পাকিস্তান হয়ে ইরানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে পুরো পরিবহন ব্যবস্থা আকাশপথে হবে নাকি স্থলপথে হবে—তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।
এদিকে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আই এস পি আর চায়না থেকে ইরানে আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র সরবরাহে পাকিস্তান জড়িত—এমন দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের খবর সম্পূর্ণ মনগড়া ও অসত্য। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, ইরান শুধু QW-12 নয়, আরও উন্নত QW-18 এবং QW-19 ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও সংগ্রহের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছিল। ইউরোপের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, এসব অস্ত্র বিক্রির একাধিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। যদিও সবগুলো চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই দশকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রাডার প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ দেখিয়েছে, কেবল দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র নয়, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ড্রোন ও নিচু দিয়ে উড়ে আসা লক্ষ্যবস্তু ঠেকাতে ম্যানপ্যাডস কার্যকর প্রতিরক্ষার একটি অতিরিক্ত স্তর তৈরি করতে পারে।
দুইটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্র এবং এক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চায়না থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য উপাদান আরও গোপনে পরিবহনের জন্য স্থলপথ ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে তেহরান। এতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
এই চুক্তি আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করছে—বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিরক্ষা আমদানির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ইরান এখনো নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনের পাশাপাশি বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরান চায়নার কাছ থেকে জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার পৃথক একটি চুক্তিরও কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে সেই আলোচনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
