জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন
ইরান অ্যামেরিকার ‘সন্ত্রাসবাদের শিকার’: পেযেশকিয়ান
- 0


প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৩ ২০২৬, ১৫:৩৫
জাতিসংঘের অধিবেশনে দেয়া প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের একদিন পর একই মঞ্চে পাল্টা জবাব দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে তিনি বলেন, ইরানের জনগণ অ্যামেরিকার ‘সন্ত্রাসবাদের শিকার’ এবং যুদ্ধের শুরুতে অ্যামেরিকা ও ইসরাইল তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। তবে শক্তির ভাষা বাদ দিয়ে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে যুদ্ধ অবসানে আলোচনা করতে প্রস্তুত।
ভাষণের শুরুতেই প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও যুদ্ধে নিহত ১৫০-এর বেশি স্কুলশিশুর বড় ছবি তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান। খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে অ্যামেরিকা ও ইসরাইলের হামলার প্রথম দিনেই নিহত হন। স্কুলে হামলার প্রসঙ্গে জাতিসংঘের একটি তথ্য অনুসন্ধান মিশন এর আগে জানিয়েছিল, একটি স্কুল ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় হামলার ঘটনায় অ্যামেরিকার দায় থাকার বিষয়ে ‘যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি’ রয়েছে এবং ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পেজেশকিয়ান বলেন, “আমরা শুধু নিজেদের রক্ষা করেছি। আমরা সন্ত্রাসী নই।” তার ভাষ্য, ইরানের নিরাপরাধ মানুষ হামলা ও আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং দেশটি সর্বশক্তি দিয়ে আত্মরক্ষা করেছে। তিনি বলেন, অ্যামেরিকা ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালিয়েছে।
অ্যামেরিকাকে উদ্দেশ করে পেজেশকিয়ান বলেন, তারা ইরানে আঘাত করেছে, কিন্তু ইরান ‘হাঁটু গেড়ে বসেনি’। ভাষণের শেষ দিকে সরাসরি ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে চাপ দিতে চায়, তাদের বুঝতে হবে—ইরান সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত; তবে শক্তির ভাষা গ্রহণ করবে না।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়। তার দাবি, ইরান কখনো আগ্রাসী ছিল না, কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং সবসময় আলোচনার টেবিলে থাকার প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে। “আমরা কখনো মাথা নত করব না, হাঁটু গেড়ে বসব না”— বলেন তিনি।
এদিকে, পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন, ইরান বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা চালায়নি। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের হামলায় ওই অঞ্চলে নাবিক ও অভিবাসী শ্রমিকসহ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে এপি জানিয়েছে। ফলে বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য না করার দাবি পুরোপুরি তথ্যসম্মত নয়।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও বার্তা দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। ভাষণে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টিও সামনে আনেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরানের প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি। পারমাণবিক বোমা নয়।
তার ভাষায়, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ইরানের অগ্রগতির একটি স্বাভাবিক অংশ। তিনি বলেন, অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকার সীমাবদ্ধ থাকা ইরান মেনে নেয় না।
পেজেশকিয়ান বলেন, “কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়, তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ওপর কোনো সীমাবদ্ধতাও নয়।”
ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে অ্যামেরিকা ও ইরানের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিরোধের জায়গা। ইরান বলে, কর্মসূচির উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ। তবে পশ্চিমা দেশগুলো ও ইসরাইলের অভিযোগ, এই কর্মসূচির মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে তেহরান। ট্রাম্পও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করাকে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।
মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতেই তার প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, যুদ্ধ অবসানে চুক্তি না হলে তিনি ইরানকে ‘ধ্বংস’ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এর পরদিন পেজেশকিয়ানের ভাষণে তাই মূলত ট্রাম্পের বক্তব্যের বিপরীতে ইরানের অবস্থানই তুলে ধরা হয়—যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ও আত্মসমর্পণ না করার বার্তার পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার দরজাও খোলা রাখার বার্তা দিয়েছে তেহরান।
জাতিসংঘের একই মঞ্চে এক দিনের ব্যবধানে ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে যুদ্ধের দুই বিপরীত অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্প সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারির পাশাপাশি চুক্তির সম্ভাবনার কথা বলেছেন; পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান আত্মসমর্পণ করবে না, তবে শক্তির চাপ ছাড়া কূটনীতি ও আলোচনায় যেতে প্রস্তুত।
ফলে যুদ্ধের সামরিক অবস্থানের পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং আলোচনার শর্তই এখন অ্যামেরিকা-ইরান সংঘাতের পরবর্তী কূটনৈতিক সমীকরণের প্রধান বিষয় হয়ে থাকছে।
