ইরান চুক্তিটি শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে, তেহরানের জন্য বন্ধ হবে পারমাণবিক অস্ত্রের পথ

টিবিএন ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ১৬ ২০২৬, ১৭:০৯
- 0
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-সেভেন সম্মেলনের ফাঁকে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, চুক্তির ভাষায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। তিনি আরও জানান, চুক্তিটি কংগ্রেসে পর্যালোচনার জন্য পাঠানোর ধারণাও তার পছন্দ হয়েছে, যা ইতোমধ্যে কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা সমর্থন করেছেন।
অ্যামেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি-ভিত্তিক অন্তর্বর্তী চুক্তির বিষয়টি কয়েক দিনের মধ্যেই জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, এই চুক্তি ইরানের জন্য “পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে একটি দেয়াল” তৈরি করবে এবং তেহরান ভবিষ্যতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-সেভেন সম্মেলনের ফাঁকে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, চুক্তির ভাষায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। তিনি আরও জানান, চুক্তিটি কংগ্রেসে পর্যালোচনার জন্য পাঠানোর ধারণাও তার পছন্দ হয়েছে, যা ইতোমধ্যে কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা সমর্থন করেছেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া অ্যামেরিকা-ইসরাইল ও ইরান সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। এপ্রিল মাসে ঘোষিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে নতুন এই অন্তর্বর্তী চুক্তি। এর আওতায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার কথাও রয়েছে।
তবে চুক্তি ঘোষণার পরও সংশয় কাটেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্যিক নৌ চলাচল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক সপ্তাহ কিংবা মাসও লেগে যেতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইটজারল্যান্ডে চুক্তির আনুষ্ঠানিক কাঠামো স্বাক্ষরের পর নতুন পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে। সেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারসহ বিভিন্ন জটিল ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে।
তবে লক্ষণীয়ভাবে, ইরানের আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়টি বর্তমান আলোচনার এজেন্ডায় নেই বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মঙ্গলবার তেলের দাম আরও ২ শতাংশের বেশি কমে তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এর আগের দিনও প্রায় ৫ শতাংশ দরপতন হয়েছিল। তবে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেযেশকিয়ান সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, অন্তর্বর্তী চুক্তিটি যুদ্ধ বন্ধের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত চুক্তির কাঠামো এখনও তৈরি হয়নি।
অ্যামেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও স্বীকার করেছেন, বর্তমানে স্বাক্ষর হতে যাওয়া স্মারকটি একটি “খুবই সাধারণ কাঠামোগত দলিল” এবং বিস্তারিত শর্তাবলি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।
চুক্তির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা চলছে। অ্যামেরিকা ও ইরানের কর্মকর্তাদের মতে, ভবিষ্যৎ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতে পারে, বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত হতে পারে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ওয়াশিংটনের অবস্থান স্পষ্ট। অ্যামেরিকান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে হলে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কমাতে হবে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার ঘোষণা এলেও নৌ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক হবে না বলে সতর্ক করেছেন শিপিং খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথে মাইন বা বিস্ফোরক রয়ে যেতে পারে। ফলে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
এদিকে লেবানন পরিস্থিতিও চুক্তির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ইরান দাবি করছে, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে। কিন্তু ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইযরায়েল কাটয স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে দখল করা নিরাপত্তা অঞ্চল থেকে ইসরাইলি বাহিনী সরে যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুও একই অবস্থান নিয়েছেন। ফলে অ্যামেরিকা-ইরান সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করলেও স্থায়ী শান্তির পথ এখনও নানা জটিলতা ও অনিশ্চয়তায় পূর্ণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

