শান্তিচুক্তি
ইরান, অ্যামেরিকা, ইসরায়েল: কার কী লাভ-ক্ষতি

টিবিএন ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ১৫ ২০২৬, ১৭:০৬ হালনাগাদ: জুন ১৬ ২০২৬, ১৭:০৩

অ্যামেরিকা, ইসরায়েল ও ইরানের জাতীয় পতাকা (বাঁ থেকে)। ছবি: কুর্দিশ২৪
- 0
যুদ্ধ শেষে ও আসন্ন শান্তিচুক্তিতে ইরান অ্যামেরিকা ও ইসরায়েল কী হারাল ও কী পেল- বিশ্লেষাণাত্মক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ ও ফার্স্টপোস্ট।
যুদ্ধ ও উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে শান্তিচুক্তির ঘোষণা দিয়েছে ইরান-অ্যামেরিকা। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চলতি সপ্তাহের শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে দুই দেশ।
এর আগে শান্তি চুক্তি আলোচনায় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ, পারমাণবিক কার্যক্রম, হরমুজ প্রণালীর ওপর প্রভাবসহ একাধিক বিষয়। অন্যদিকে কয়েক মাসব্যাপী যুদ্ধে সরাসরি জড়িত ছিল ইসরায়েল।
যুদ্ধ শেষে ও আসন্ন শান্তিচুক্তিতে ইরান অ্যামেরিকা ও ইসরায়েল কী হারাল ও কী পেল- বিশ্লেষাণাত্মক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ ও ফার্স্টপোস্ট।
ইরানের লাভ ক্ষতির মিশ্র ফলাফল
অর্থনীতি
ইরানে অ্যামেরিকা এমন সময় হামলা শুরু করেছিল, যখন দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্র সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ আন্দোলন চলমান। ক্ষমতাসীন খামেনি সরকারের বিরুদ্ধে চলমান বিদ্রোহে ইরান যখন অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল, তখন শুরু হওয়া যুদ্ধ এ সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে বিদেশে জব্দ হওয়া ইরানের ২৫ বিলিয়ন ডলার মুক্ত করতে যাচ্ছে অ্যামেরিকা।
পারমাণবিক ভবিষ্যত
বিরোধের অন্যতম কারণ ইরানের ৪০০কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সংরক্ষণ ও পারমাণবিক স্থাপনা চালু রাখার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে- তা এখনও অজানা।
অ্যামেরিকান কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দ্য ফার্স্টপোস্ট জানায়, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এখনও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর কিংবা ধ্বংস করতে চান। একইসঙ্গে, রাশিয়া বারবার ইরানের ইউরেনিয়াম তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিতে প্রস্তাব দিয়ে আসছে। যার ফলে, ইউরেনিয়াম নিজ দেশে রাখা ও পারমাণবিক কার্যক্রম চালু রাখার দাবিতে এখনও সফলতা অর্জন করতে পারেনি ইরান।
জার্মানি, ব্রিটেইন, ফ্রান্সসহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো পর্যবেক্ষণ ও সীমাবদ্ধতার আওতায় এনে ইরানকে পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিতে অ্যামেরিকাকে আহ্বান জানিয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শান্তিচুক্তির পরবর্তী ধাপে ইরানের পারমাণবিক ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা হবে।
হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব
এ যুদ্ধে ইরানের অন্যতম হাতিয়ার ছিল বিশ্বে জ্বালানি তেল সরবরাহের আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালি। ইরান কর্তৃক প্রণালিটি বন্ধের এক পর্যায়ে বিশ্বে জ্বালানি তেলের সংকট ও অর্থনৈতিক টানাপোড়ন দেখা দেয়। যার ফলে, চীন, রাশিয়া, ইরান ও তেল সমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত যুদ্ধ বন্ধে অ্যামেরিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। যুদ্ধাবস্থায় নৌ অবরোধসহ হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানকে চাপ দিতে একাধিক পদক্ষেপ নেয় অ্যামেরিকা। তবে শেষ পর্যন্ত অ্যামেরিকান বাহিনীর চাপে নতি স্বীকার না করে, নিজেদের সিদ্ধান্তেই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করছে ইরান- যা গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথের ওপর ইরানের আধিপত্য নিশ্চিত করে।
প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক ফলাফল
ইরানের আকশে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ হামলা করে যুদ্ধের শুরু করে অ্যামেরিকা। প্রায় ৪ মাস ব্যাপী যুদ্ধে দেশটির আকাশপথে অনেকাংশেই অ্যামেরিকান আধিপত্য দেখা যায়। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে অ্যামেরিকান অবরোধের জেরে ইরানের নৌবাহিনী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে পরিকল্পিত হামলায় নিহত হন দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অনেক শীর্ষ রাজনৈতিক কর্মকর্তা। তবে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও সংঘটিত যুদ্ধের ভিতরও খামেনি সরকার সচল থাকতে সক্ষম হয়েছে, যা ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থা ও ক্ষমতাসীন সরকারের টিকে থাকা আরও নিশ্চিত করেছে।
অ্যামেরিকা
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাম জানায়, ইরান যুদ্ধে শত্রু দেশের ওপর ইচ্ছাধীন আঘাত হেনে নিজেদের শক্তি দেখাতে চেয়েছিল অ্যামেরিকান বাহিনী। তবে এ যুদ্ধ বিভিন্নভাবে তাদের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে দেয়।
যুদ্ধাবস্থায় বিভিন্ন দেশে অবস্থিত ২০টি অ্যামেরিকান সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় ইরান। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ক্ষতির পাশাপাশি এর ফলে মিত্র দেশগুলোর কাছে নির্ভরযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততাও হারায় অ্যামেরিকা।
অন্যদিকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া অন্যান্য দেশের তুলনায় অ্যামেরিকা অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখ কম দেখলেও, দেশের নাগরিকরা যুদ্ধাবস্থাকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য দায়ী করছেন।
চলমান যুদ্ধে জ্বালানি তেলের সরবরাহে ঘাটতি হওয়ায় অ্যামেরিকায় পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায়, অ্যামেরিকান পরিবারগুলোতে গড়ে প্রায় ৪৫০ ডলার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
ট্রাম্পের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব
গত মে মাসে ফক্স নিউজের এক জরিপে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ অ্যামেরিকান ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। এদিকে যুদ্ধের ফলে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পাশাপাশি নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির অনেক সদস্যেরও সমর্থন হারিয়েছেন ট্রাম্প। নভেম্বর মাসে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে, যা ট্রাম্প ও তার দলের জন্য হুমকিস্বরূপ।
এদিকে শান্তিচুক্তির ঘোষণা এলেও, যুদ্ধ বন্ধে নিজের দেওয়া প্রধান শর্তগুলো এখনও পূরণ করতে পারেননি ট্রাম্প।
এছাড়াও হামলা শুরু থেকে ট্রাম্প বারবার বলে এসেছেন, ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হবে। যুদ্ধ চলাকালীন, অ্যামেরিকা দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যপক হামলা চালালেও, ইরান এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইউরেনিয়াম মজুদ রেখেছে ও পারমাণবিক কার্যক্রম চালু রেখেছে।
ইসরায়েল
ইরানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে যুদ্ধ শুরু করেছিল অ্যামেরিকা ও ইসরায়েল। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে একরকম আড়াল করেই শান্তিচুক্তি করতে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র জানায়, যুদ্ধের জেরে ট্রাম্প নানাভাবে নেতানিয়াহুর উপর হতাশ হয়েছেন এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ইরানের শক্ত অবস্থান থাকায় দেশটির ওপর প্রভাব বিস্তার করতেও ব্যর্থ হয়েছে ইসরায়েল।
যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহু ইসরায়েলি নাগরিকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান তাকে খামেনি সরকারব্যবস্থা ধ্বংস করার সুযোগ এনে দিয়েছে।
তবে দেশটির সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনও সক্রিয়। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও হরমুজ প্রণালিতে প্রভাবও বহাল রয়েছে।
এদিকে, শান্তিচুক্তি স্থাপনে ইরানের অন্যতম শর্ত হলো লেবাননে ইসরায়েলের হামলা পুরোপুরি বন্ধ করা। ট্রাম্প সম্প্রতি হামলা বন্ধে নেতানিয়াহুকে চাপ দিলে, তাতে অসম্মতি জানায় ইসরায়েল। যার ফলে, ইসরায়েল এমন একটি অবস্থায় রয়েছে-যেখানে ট্রাম্পের সাথে নেতানিয়াহুর সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে এবং লেবানন প্রসঙ্গে কী করা সম্ভব, তা এখন অনিশ্চিত।

