বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন ধাপে অ্যামেরিকা, কানাডার ২০ মিলিয়ন ডলারের পণ্যে ৫০% শুল্কারোপের ঘোষণা
- 0


প্রকাশিত: জুলাই ২১ ২০২৬, ১৬:১৬
কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিভিন্ন পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ নতুন আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের দাবি, অ্যামেরিকান গাড়ি, মদ ও দুগ্ধপণ্যের প্রতি কানাডার বৈষম্যমূলক নীতির জবাব হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত উত্তর অ্যামেরিকার দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
সোমবার ঘোষিত এই শুল্ক ৩০ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ১৯ অগাস্ট থেকে কার্যকর হবে। নতুন শুল্কের আওতায় থাকবে ওয়াইন, সিমেন্ট, আইস হকি সরঞ্জাম, দুগ্ধপণ্য, সুইমিং পুল, আসবাবপত্র, মাছ ধরার সরঞ্জাম, বীজ, পোশাক, উইগসহ বিভিন্ন ভোক্তা পণ্য।
এই পদক্ষেপে ট্রাম্প প্রশাসন ব্যবহার করেছে ১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্টের সেকশন ৩৩৮, যা কোনো দেশ অ্যামেরিকান পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা নিলে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয়। প্রায় এক শতকের ইতিহাসে এই আইনের এমন ব্যবহার এবারই প্রথম বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।
অ্যামেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, অন্য অংশীদার দেশগুলোর মতো কানাডা পারস্পরিক সমাধানের পথে না গিয়ে অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে পাল্টা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে। তার অভিযোগ, জাতীয় নিরাপত্তাসংবেদনশীল শিল্পকে সুরক্ষা এবং বাণিজ্য ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে অ্যামেরিকার প্রচেষ্টার জবাবে কানাডা প্রতিশোধমূলক নীতি অনুসরণ করছে।
তবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ নিরসনে তার সরকার ইতোমধ্যে বিস্তৃত প্রস্তাব দিয়েছে। তার দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের আগের শুল্ক ব্যবস্থাগুলো অ্যামেরিকা-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (USMCA)-এর লঙ্ঘন ছিল।
কার্নি বলেন, এই বাণিজ্য বিরোধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ পরিবার, বিশেষ করে অ্যামেরিকান ভোক্তারা। তবু পারস্পরিক স্বার্থে বাকি সমস্যাগুলোর সমাধানে কানাডা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের অভিযোগ, কানাডার দুগ্ধপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় সংরক্ষণবাদী নীতি, অ্যামেরিকান গাড়ির ওপর শুল্ক ও কোটা এবং বেশ কয়েকটি প্রদেশে অ্যামেরিকান মদ বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া—এসবই নতুন শুল্ক আরোপের অন্যতম কারণ। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে কানাডায় অ্যামেরিকান মোটরযান রপ্তানি ২২ শতাংশ এবং অ্যালকোহলজাত পণ্যের রপ্তানি ৮১ শতাংশ কমেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, নতুন শুল্ক ইউএসএমসিও এর আওতায় থাকা শুল্কমুক্ত সুবিধার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তবে জ্বালানি, পটাশ, মাছ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং আগে থেকেই পৃথক শুল্ক ব্যবস্থার আওতায় থাকা কিছু পণ্য এই সিদ্ধান্তের বাইরে থাকবে।
এই ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। রোববার নিউ জার্সিতে বিশ্বকাপ ফাইনাল উপলক্ষে ট্রাম্প ও কার্নির বৈঠকের একদিন পরই এ সিদ্ধান্ত এলো। ওই বৈঠকে ট্রাম্প কানাডার দাবানলের ধোঁয়ায় অ্যামেরিকার ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক মূল্য আরোপেরও হুমকি দিয়েছিলেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্ট একসময় মহামন্দার সময় বৈশ্বিক পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপকে আরও তীব্র করেছিল। প্রায় এক শতক পর সেই একই আইনের প্রয়োগ নতুন করে উত্তর অ্যামেরিকার বাণিজ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি করল। বর্তমান সিদ্ধান্ত কেবল অ্যামেরিকা ও কানাডার সম্পর্কেই নয়, বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
