ইরানি হামলা এড়াতে হরমুজ দিয়ে গোপনে তেল পাঠাচ্ছে আরব আমিরাত
- 0


প্রকাশিত: মে ৭ ২০২৬, ১৫:৩৩
ইরানি হামলা এড়াতে অবস্থান শনাক্তকারী ট্র্যাকার বন্ধ রেখেই হরমুজ প্রণালী পাড়ি দিচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলবাহী ট্যাঙ্কার। অ্যামেরিকা-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের কারণে উপসাগরে আটকে থাকা তেল সরাতে ঝুঁকিপূর্ণ এই পদ্ধতিতে রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে আবুধাবি।
শিপিং ডেটা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি বা অ্যাডনক অন্তত ৬ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উপসাগরের ভেতরের টার্মিনাল থেকে রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ছিল ৪ মিলিয়ন ব্যারেল আপার জাকুম ক্রুড এবং ২ মিলিয়ন ব্যারেল দাস ক্রুড।
যুদ্ধ শুরুর আগে আমিরাতের স্বাভাবিক রপ্তানির তুলনায় এই পরিমাণ অনেক কম হলেও, পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উপসাগরের অন্য বড় উৎপাদক দেশগুলো—ইরাক, কুয়েত ও কাতার—রপ্তানি প্রায় বন্ধ রেখেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব লোহিত সাগর রুট ব্যবহার করছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, রপ্তানিকৃত তেলের একটি অংশ জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তর বা এসটিএস ট্রান্সফারের মাধ্যমে অন্য ট্যাঙ্কারে তুলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রিফাইনারিতে পাঠানো হয়েছে। কিছু তেল ওমানের স্টোরেজ টার্মিনালে জমা করা হয় এবং কিছু সরাসরি সাউথ কোরিয়ার রিফাইনারিতে পাঠানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কৌশলের মাধ্যমে অ্যাডনক ছোট ছোট কার্গোতে তেল বিক্রি করতে পারছে এবং বড় ভিএলসিসি ট্যাঙ্কারগুলো দ্রুত আবার উপসাগরে ফিরে গিয়ে নতুন তেল তুলতে পারছে।
তবে এই যাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সোমবার আমিরাত অভিযোগ করেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় খালি একটি অ্যাডনক ট্যাঙ্কার—বারাকাহ—ইরানি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।
ইরানি বাহিনীর নজর এড়াতে ট্যাঙ্কারগুলো তাদের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বা এআইএস ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখছে। ফলে সেগুলোর অবস্থান সহজে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। সাধারণত অ্যামেরিকান নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান নিজেও এই কৌশল ব্যবহার করে থাকে।
এই কারণে আমিরাতের প্রকৃত রপ্তানি পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিপিং ডেটা অনুযায়ী, ভিএলসিসি হাফিত ৭ এপ্রিল উপসাগরের ভেতরে ২ মিলিয়ন ব্যারেল আপার জাকুম তেল তুলেছিল এবং ১৫ এপ্রিল হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে। পরে ফুজাইরাহ উপকূলে সেই তেল গ্রিক পতাকাবাহী অলিম্পিক লাক ট্যাঙ্কারে স্থানান্তর করা হয়। এরপর তেলটি মালয়েশিয়ার পেঙ্গেরাং রিফাইনারিতে পাঠানো হয়, যা পেট্রোনাস ও সৌদি আরামকোর যৌথ প্রকল্প।
এছাড়া আলিয়াকমন-ওয়ান নামের আরেকটি ট্যাঙ্কার ২ মিলিয়ন ব্যারেল দাস ক্রুড নিয়ে ওমানের রাস মারকাজ স্টোরেজ টার্মিনালে পৌঁছেছে। আরও দুটি সুয়েজম্যাক্স ট্যাঙ্কার সাউথ কোরিয়ার দিকে ১ মিলিয়ন ব্যারেল করে আপার জাকুম তেল নিয়ে গেছে বলে তথ্য মিলেছে।
এদিকে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান কার্যত নিজেদের ছাড়া অন্য সব জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ আটকে পড়ে। একই সঙ্গে অ্যামেরিকার নৌ অবরোধ ইরানি রপ্তানিও থামিয়ে দিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই ঝুঁকিপূর্ণ রপ্তানি কৌশল দেখাচ্ছে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন জ্বালানি বাণিজ্য সচল রাখতে কতটা চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালী ঘিরে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীলতা আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
