বিবিসির প্রতিবেদন:
দুবাইয়ে বিকৃত যৌন ব্যবসা চক্রের প্রধান চিহ্নিত, শিকার যেসব নারী

টিবিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৭ ২০২৫, ৫:৪৫

চক্রের মূল হোতা হিসেবে চার্লস মোসিগা নামের এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে বিবিসির অনুসন্ধানী দল। ছবি: বিবিসি

চক্রের মূল হোতা হিসেবে চার্লস মোসিগা নামের এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে বিবিসির অনুসন্ধানী দল। ছবি: বিবিসি

  • 0

অর্থলোভী কিছু নারী ইনফ্লুয়েন্সারের ছদ্মবেশে বিলাসী জীবনযাপনের খরচ জোগাতে গোপনে মানুষের যথেচ্ছ যৌন চাহিদা মিটিয়ে থাকেন।

দুবাইয়ের ‘উন্মত্ত’ সেক্স পার্টি নিয়ে নানা গুজব, ব্যঙ্গ এবং জল্পনা বহু বছর ধরেই শোনা যায়। টিকটকে এ-সম্পর্কিত একটি হ্যাশট্যাগ দেখা হয়েছে ৪৫ কোটিরও বেশি বার।

এসব কনটেন্টে অভিযোগ ওঠে, অর্থলোভী কিছু নারী ইনফ্লুয়েন্সারের ছদ্মবেশে বিলাসী জীবনযাপনের খরচ জোগাতে গোপনে মানুষের যথেচ্ছ যৌন চাহিদা মিটিয়ে থাকেন।

সম্প্রতি বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য বলছে, বাস্তবতা কল্পনার চেয়ে আরও বেশি ভয়াবহ।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের অন্যতম বিলাসবহুল এলাকায় গড়ে ওঠা একটি যৌন ব্যবসা ও নারী নির্যাতন চক্রের মূল হোতা হিসেবে চার্লস মোসিগা নামের এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে বিবিসির অনুসন্ধানী দল।

চার্লস মোসিগা নামের ওই ব্যক্তি পরিচয়-গোপনকারী বিবিসি প্রতিবেদককে বলেন, এক সেক্স পার্টির জন্য তিনি সর্বনিম্ন এক হাজার ডলার দরে নারী সরবরাহ করতে পারবেন। তারা অনেকেই গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে ‘প্রায় সবকিছুই’ করতে পারবে। মোসিগা লন্ডন শহরের সবেক একজন বাসচালক হিসেবে নিজের পরিচয় দেন।

উগান্ডার বেশ কয়েকজন তরুণী বিবিসিকে বলেছেন, তারা ভাবেননি যৌনকর্মে নিয়োজিত হতে হবে। কেউ কেউ মনে করেছিলেন, তারা দুবাইয়ে গিয়ে সুপার মার্কেট বা হোটেলে কাজ করবেন।

‘মিয়া’ (ছদ্মনাম) নামে এক তরুণী বলেন, মোসিগার এনে দেওয়া এক গ্রাহক নিয়মিত মেয়েদের গায়ে মলত্যাগ করতে চাইতেন। মোসিগার চক্র তাকে প্রতারণার মাধ্যমে এই পেশায় জড়িয়েছে বলেও জানান তিনি।

মোসিগা যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কেবল বাসা ভাড়া পেতে সহায়তা করেন এবং নারীরা তার সঙ্গে বিভিন্ন পার্টিতে যান, কারণ তার ধনী লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে।

বিবিসি আরও জানায়, মোসিগার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দু’জন নারী দুবাইয়ের সুউচ্চ ভবন থেকে পড়ে মারা গেছেন। যদিও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি আত্মহত্যা; তবে নিহতদের পরিবার ও বন্ধুরা বিশ্বাস করেন, এগুলো সঠিকভাবে তদন্ত করা হয়নি।

মারা যাওয়া নারীদের একজন মোনিক কারুঙ্গি, যিনি পশ্চিম উগান্ডা থেকে এসে মোসিগার ব্যবস্থাপনায় থাকা একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। সেই ফ্ল্যাটে একই সঙ্গে থাকতেন প্রায় ৫০ জন নারী। ওই ফ্ল্যাটটিকে মিয়া ‘বাজার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

মোনিকের বোন রিতা জানান, তার বোন দুবাই গিয়েছিলেন একটি সুপার মার্কেটে কাজ করার জন্য। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

মিয়া বলেন, মোনিক মোসিগার চাহিদা মানতে অস্বীকৃতি জানাতেন এবং চক্র থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন। তিনি একটি চাকরি পেয়ে অন্য ফ্ল্যাটে চলে যান। কিন্তু সেই বাসার বারান্দা থেকে ২০২২ সালের ১ মে তিনি পড়ে যান।

মিয়া জানান, তিনি দেশে ফেরার কথা বলতেই মোসিগা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। মিয়ার কাছে তিনি ২ হাজার ৭১১ ডলার পাবেন। সময়মতো পরিশোধ না করলে তা দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

মোনিকের আত্মীয় মাইকেল (ছদ্মনাম) জানান, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মোসিগার কাছে মোনিকের ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৭ হাজার ডলার। মোনিক প্রায়ই কান্নাভেজা ভয়েস নোট পাঠিয়ে সহায়তা চাইতেন।

মিয়া বলেন, বেশিরভাগ গ্রাহক ছিলেন ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। তাদের অনেকে ছিল চরম বিকৃত যৌনচাহিদায় আসক্ত। নিচু গলায় তিনি বলেন, এক গ্রাহক মেয়েদের গায়ে মলত্যাগ করে সেটি খাওয়াতে চাইতেন।

চার্লস মোসিগাকে চিহ্নিত করা সহজ ছিল না। অনলাইনে তার পেছন থেকে তোলা একটি ছবিই ছিল অনুসন্ধানীদের একমাত্র সূত্র। বিভিন্ন নামে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করতেন তিনি। ছদ্মবেশে অনুসন্ধান ও চক্রের এক সাবেক সদস্যের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাকে দুবাইয়ের জুমেইরাহ এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়।

‘ট্রয়’ নামে এক ব্যক্তি জানান, মোসিগা কখনো নিজের নাম ব্যবহার করতেন না। গাড়ি, বাসা বা অন্য যে কোনো কাজে তিনি ট্রয়সহ অন্যদের নাম ব্যবহার করতেন।

মোনিকের পরিবার আজও তার মরদেহ পায়নি। বিবিসি অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাকে দাফন করা হয়েছে দুবাইয়ের আল কুসাইস কবরস্থানের ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ অংশে। মোনিকের বোন রিতা বলেন, তাদের পরিবার এখন শুধু শোক নয়, আতঙ্কেও রয়েছে, যেন এমন ঘটনা আর কারও না ঘটে চার্লস মোসিগার কাছে বিবিসি তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব অভিযোগ মিথ্যা।’