অনলাইনে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সমালোচনা করে পোস্ট দেওয়ায় জর্জিয়ার টেলিভিশন সাংবাদিক ভাখো সানাইয়াকে ৩০ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দেশটির আদালত এ রায় দেয়। এ ঘটনায় জর্জিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদ সংস্থা ইন্টারপ্রেস এর বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, বিরোধী দল-সমর্থিত টেলিভিশন চ্যানেল ফর্মুলা’র সাংবাদিক ও উপস্থাপক ভাখো সানাইয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টের মাধ্যমে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার শালভা পাপুয়াশভিলি ও ক্ষমতাসীন জর্জিয়ান ড্রিম পার্টির আরেক নেতা ভ্লাদিমির বোজাদজেকে অপমান করার অভিযোগ আনা হয়। এ নিয়ে এটি তাঁর দ্বিতীয়বার আটক এবং তৃতীয়বারের মতো শাস্তি। এর আগে গত জুলাই মাসেও একই ধরণের ফেসবুক পোস্টের জন্য তাকে ৬,০০০ জর্জিয়ান লারি জরিমানা এবং ১৪ দিনের প্রশাসনিক কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
এই রায়ের পর আদালত কক্ষ থেকে ইন্টারপ্রেসের মাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে সাংবাদিক ভাখো সানাইয়া তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার এই গ্রেপ্তারের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজকে স্তব্ধ করে দেওয়া।” স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি আরো বলেন, “এই স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে আমাদের যতদিনই লাগুক না কেন, আমরা তা করেই ছাড়বো।”
জর্জিয়া সরকার সম্প্রতি চলতি বছরের গ্রীষ্মকালে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নতুন বিশেষ শাখা গঠন করেছে, যার মূল কাজ হলো জনসাধারণের এমন সব বক্তব্য বা অনলাইন পোস্ট পর্যবেক্ষণ করা যা "মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এবং হেট স্পিচ ছড়ায়"। মূলত তথাকথিত "হেট স্পিচ" বা ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগে সরকার যে ধারাবাহিক বিচারিক তৎপরতা চালাচ্ছে, সানাইয়ার এই সাজা তারই ধারাবাহিক অংশ। নতুন এই ব্যবস্থা চালুর পর থেকে সরকারবিরোধী মন্তব্য ও প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের ঘটনায় বহু মানুষকে আটক ও জরিমানা করা হয়েছে।
২০১২ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা বর্তমান রাজনৈতিক দল ‘জর্জিয়ান ড্রিম’ ২০২৪ সালের অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকেই বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী এবং স্বাধীন গণমাধ্যমগুলোর ওপর কড়াকড়ি চরম মাত্রায় বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি জর্জিয়া সরকার তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে (EU) যোগদানের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের এই দেশটিতে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে তারা দেশের ‘কর্তৃত্ববাদী ও রুশপন্থী মোড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ব্যাপক বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে, কারণ আগামী সপ্তাহেই জর্জিয়ার সাংবিধানিক আদালত ক্ষমতাসীন ‘জর্জিয়ান ড্রিম’ দলের করা একটি মামলার শুনানি করবে, যেখানে দেশের বৃহত্তম বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। এমন শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যেই প্রখ্যাত সাংবাদিক ভাখো সানাইয়াকে কারাদণ্ড দেওয়া হলো, যা জর্জিয়ায় গণতন্ত্র ও মুক্ত সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎকে এক বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।