ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের চূড়ান্ত নথি প্রকাশ, যা আছে ১৪দফা প্রস্তাবে

টিবিএন ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ১৭ ২০২৬, ১৮:০০

সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, বুধবার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা নথিতে থাকা ১৪ দফা প্রস্তাব পাঠ করেন।
- 0
নথিটির শিরোনাম রাখা হয়েছে, অ্যামেরিকা ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক। প্রাথমিকভাবে শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে নথিতে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা, ইরানের উপর আরোপিত কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচী নিয়ে ভবিষ্যত আলোচনায় প্রত্যাশা নির্ধারণ করার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধ ও শান্তিচুক্তি স্থাপনে ইরান ও অ্যামেরিকার মধ্যে চূড়ান্ত হওয়া সমঝোতা স্মারকের আনুষ্ঠানিক নথি প্রকাশ করেছে অ্যামেরিকা।
সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, বুধবার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা নথিতে থাকা ১৪ দফা প্রস্তাব পাঠ করেন। নথির বিস্তারিত জনসমক্ষে প্রকাশ না করা নিয়ে তীব্র সমালোচনার পর, এটি সামনে আনা হয়েছে।
নথিটির শিরোনাম রাখা হয়েছে, অ্যামেরিকা ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক। প্রাথমিকভাবে শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে নথিতে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা, ইরানের উপর আরোপিত কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচী নিয়ে ভবিষ্যত আলোচনায় প্রত্যাশা নির্ধারণ করার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। জেনে নিন খসড়ায় উল্লেখিত ১৪ দফা প্রস্তাবের বিস্তারিত।
১. অ্যামেরিকা এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান, এবং বর্তমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা, এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে সকল ফ্রন্টে, লেবাননসহ, সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিচ্ছে। তারা অঙ্গীকার করছে যে ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না এবং একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকবে। পাশাপাশি, তারা লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে সকল ফ্রন্টে, লেবাননসহ, যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি এবং এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য বিধান নিশ্চিত করা হবে।
২. অ্যামেরিকা এবং ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।
৩. অ্যামেরিকা এবং ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে, পারস্পরিক সম্মতিতে মেয়াদ বৃদ্ধি করা যেতে পারে, একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও তা সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
৪. এই সমঝোতা স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে অ্যামেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ ও অন্যান্য বিঘ্ন বা প্রতিবন্ধকতা অপসারণ শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। এই সময়ে ইরান কর্তৃক যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের জাহাজ চলাচলের সংখ্যার অনুপাতে নৌযান চলাচল পুনঃস্থাপন করা হবে। এছাড়া, চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে অ্যামেরিকা ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে তার বাহিনী প্রত্যাহার করবে।
৫. এই সমঝোতা স্বাক্ষরের পর ইরান তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ৬০ দিনের জন্য বিনামূল্যে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে, যা পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীত দিকে চলাচল করবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে। প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং মাইন অপসারণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণ কার্যক্রম চালু করা হবে। ইরান ওমান সালতানাতের সঙ্গে সংলাপ করবে এবং অন্যান্য পারস্য উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ও হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকারের আলোকে ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নির্ধারণ করবে।
৬. অ্যামেরিকা তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ন্যূনতম ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি চূড়ান্ত, পারস্পরিকভাবে সম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নের অঙ্গীকার করছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদ্ধতি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত হবে। প্রয়োজনীয় সকল লাইসেন্স, অব্যাহতি ও অনুমোদন অ্যামেরিকা প্রদান করবে।
৭. অ্যামেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সকল ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করছে, যার মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবসমূহ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা-আইএইএর গভর্নর বোর্ডের প্রস্তাবসমূহ এবং অ্যামেরিকার সকল একতরফা (প্রাথমিক ও গৌণ) নিষেধাজ্ঞা। এসব একটি সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে সম্পন্ন হবে। উভয় পক্ষ এই বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করে এবং দ্রুত এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর ইচ্ছা প্রকাশ করছে।
৮. ইরান পুনরায় নিশ্চিত করছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা উন্নয়ন করবে না। অ্যামেরিকা ও ইরান সম্মত হয়েছে যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা পারস্পরিকভাবে সম্মত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, যা সপ্তম অনুচ্ছেদে বর্ণিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং সর্বনিম্ন পর্যায়ে সাইটেই (অন-সাইট) আইএইএর তত্ত্বাবধানে নিম্ন-সমৃদ্ধ করা হবে। উভয় পক্ষ ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং অন্যান্য পারস্পরিকভাবে সম্মত বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে, যা চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারিত সন্তোষজনক কাঠামোর ভিত্তিতে হবে। চূড়ান্ত চুক্তি এই অনুচ্ছেদের বিধানসমূহ নিশ্চিত করবে। উভয় পক্ষ এই বিষয়গুলোর গুরুত্ব স্বীকার করে এবং দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর ইচ্ছা প্রকাশ করছে।
৯. চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদিত না হওয়া পর্যন্ত অ্যামেরিকা ও ইরান বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরান তার বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থা বজায় রাখবে এবং অ্যামেরিকা নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং অঞ্চলে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করবে না।
১০. অ্যামেরিকা অঙ্গীকার করছে যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে এবং নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত অ্যামেরিকান ট্রেজারি বিভাগ ইরানি অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও তাদের উপজাত রপ্তানির জন্য এবং সংশ্লিষ্ট সকল সেবা—ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা, পরিবহন ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় অব্যহতি প্রদান করবে।
১১. অ্যামেরিকা এই সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের সকল জব্দ বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত করার অঙ্গীকার করছে। এসব তহবিল মুক্ত করার পদ্ধতি উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করবে। সংশ্লিষ্ট অর্থ মূল হিসাবে থাকুক বা স্থানান্তরিত হোক, তা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক মনোনীত যেকোনো চূড়ান্ত সুবিধাভোগীর কাছে সম্পূর্ণরূপে ব্যবহারযোগ্য হবে। এ জন্য অ্যামেরিকা প্রয়োজনীয় সকল লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রদান করবে।
১২. অ্যামেরিকা ও ইরান সম্মত হয়েছে যে সমঝোতা স্মারকের সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে চূড়ান্ত চুক্তির প্রতিপালন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নির্বাহী প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা হবে।
১৩. এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এবং ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর, এবং এসব ব্যবস্থা কার্যকর থাকা সাপেক্ষে, অ্যামেরিকা ও ইরান অন্যান্য অনুচ্ছেদসমূহ নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করবে।
১৪. চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

