


প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭ ২০২৬, ১৫:২৫
ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ফাইল ফটো। ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় শাসন করার পর এবার ক্ষমতা ছাড়ার স্পষ্ট ঘোষণা দিলেন ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসি। শনিবার দেশটির নিউ ক্যাপিটালে মিলিটারী একাডেমির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ২০৩০ সালেই তার শাসনের সমাপ্তি ঘটবে এবং সংবিধানে আর কোনো হাত দেয়া হবে না।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আল সিসি বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি ইজিপ্টের সংবিধানে আর কোনো হাত দেয়া হবে না। শ্রদ্ধেয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব নাশাত আল-দিহি এবং মোস্তফা বাকরি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি তাদের স্পষ্ট বলেছি, ২০৩০ সালই হবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার মেয়াদের শেষ সময়। এই বিষয়টি সম্পূর্ণ মীমাংসিত এবং এটি নিয়ে আর কোনো আলোচনার সুযোগ নেই।’

৭১ বছর বয়সী এই সামরিক শাসক জানান, ক্ষমতা ছাড়ার আগে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণের জন্য উপযুক্ত ও সক্ষম নেতৃত্ব তৈরি করে যেতে চান তিনি। তৃতীয় মেয়াদে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছয় বছরের জন্য পুনর্নির্বাচিত হওয়া সিসির এই ঘোষণাকে ইজিপ্টের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০১৩ সালের জুলাইয়ে গণতান্ত্রিকভাবে দেশটির প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। লাখো মানুষের সেই আন্দোলনকে পুঁজি করে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোহাম্মদ মুরসি বেশিদিন জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারেননি। মাত্র এক বছরের মধ্যে তার সরকারের বিরুদ্ধে মিশরজুড়ে অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভ ও আন্দোলন গড়ে ওঠে। তার এই এক বছরের শাসনামলে মিসরে জ্বালানি সংকট, অতিরিক্ত লোডশেডিং, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার অভাব এবং বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয়।
এছাড়া ২০১২ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট মুরসি একটি অধ্যাদেশ জারি করেন, যার মাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্তকে বিচারিক পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে স্থাপন করেন। এতে সুশীল সমাজ, বিচার বিভাগ ও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর মধ্যে ভয় তৈরি হয় যে তিনি একচ্ছত্র স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠা করছেন।
অন্যদিকে প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের অনুগতদের বসানোর অভিযোগ ওঠে, যা আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর সাথে মুরসি সরকারের তীব্র দূরত্ব তৈরি করে।
এই চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও লাখ লাখ মানুষের রাজপথ দখলের সুযোগ নিয়েই ২০১৩ সালের ৩ জুলাই সেনাপ্রধান জেনারেল সিসি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুরসিকে উৎখাত করেন।
ক্ষমতা দখলের পর ব্রাদারহুডের ওপর শুরু হয় তীব্র দমনপীড়ন, আর সিসি প্রতিষ্ঠা করেন সেনাকেন্দ্রিক একচ্ছত্র শাসন। এরপর ২০১৯ সালের এক বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ চার বছর থেকে বাড়িয়ে ছয় বছর করেন সিসি। একইসাথে তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পথও সুগম করেন সিসি।
অন্যদিকে বৈধতার প্রশ্নে বিতর্ক ও সমালোচনা থাকলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে ইজিপ্টের সামরিক ও জ্বালানি সক্ষমতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। একইসাথে কায়রোর পূর্বে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মেগাসিটি হিসেবে নতুন রাজধানী স্থাপন ছিলো তার জন্য চ্যালেঞ্জিং সফলতা।
