ডিজেলের দামে রেকর্ড, অপ্রত্যাশিতভাবে লাভবান হচ্ছে যারা
- 0


প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫ ২০২৬, ১৫:০৬
অ্যামেরিকায় ডিজেলের জাতীয় গড় দাম রেকর্ড ৬ দশমিক ৫৩ ডলার প্রতি গ্যালনে উঠেছে, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষি, ট্রাক পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়লেও বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো ছাড়াও একই সময়ে কয়েকটি খাত নতুন ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছে বা লাভবান হচ্ছে। বিশেষ করে ট্রাক থেকে রেলপথে পণ্য পরিবহন বাড়ায় রেল কোম্পানি, আন্তঃপরিবহন সেবা এবং বিকল্প জ্বালানি খাত এই সুবিধাভোগীর তালিকায় রয়েছে।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি চাপে পড়েছে অ্যামেরিকার ট্রাক পরিবহন খাত। ট্রাকচালকদের জন্য সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে, কারণ জ্বালানির দাম যেভাবে দ্রুত বাড়ছে, পরিবহন ভাড়ার সঙ্গে সেই বাড়তি খরচ সবসময় একই গতিতে সমন্বয় করা যাচ্ছে না।
অ্যামেরিকান ট্রাকিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ বব কস্টেলোর মতে, সপ্তাহের মাঝামাঝি ডিজেলের দাম বাড়লে ট্রাকচালকদের পক্ষে সেই অতিরিক্ত খরচ পুরোপুরি আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের একটি অংশ তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
কিন্তু এই চাপই অন্য কয়েকটি খাতের জন্য তৈরি করছে নতুন সুযোগ।
১. রেলপথ
রেকর্ড ডিজেলের দামে সবচেয়ে স্পষ্ট সুবিধা পাচ্ছে মালবাহী রেলপথ। কারণ ট্রেনও ডিজেল ব্যবহার করলেও একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনে ট্রাকের তুলনায় অনেক বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী। প্রতি টন পণ্য এক মাইল পরিবহনে মালবাহী ট্রেন প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি দক্ষ।
ফলে ট্রাকে পণ্য পাঠানোর খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু পণ্য রেলপথে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
ইউনিয়ন প্যাসিফিকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব পণ্য আগে ট্রাকে পরিবহন করা হতো, সেগুলোর একটি অংশ এখন রেলে আসছে। কলা, আসবাবপত্র ও টেলিভিশনের মতো পণ্যভর্তি কনটেইনার ও ট্রেলারও বাড়ছে রেলপথে। আগস্টে অ্যামেরিকার রেলপথে এ ধরনের আন্তঃপরিবহন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
২. রেলভিত্তিক আন্তঃপরিবহন সেবা
সুবিধা পাচ্ছে ট্রাক ও রেলের সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা, যাকে আন্তঃপরিবহন বলা হয়।
জে বি হান্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসেস জানিয়েছে, ট্রাক ও ট্রেনের মধ্যে পরিবহন ব্যয়ের ব্যবধান এখন তাদের দেখা সবচেয়ে বড় পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির রেলভিত্তিক আন্তঃপরিবহন ব্যবসায় বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ, ডিজেলের দাম যত বেশি সড়ক পরিবহনকে ব্যয়বহুল করছে, রেলভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা তত বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।
৩. বাণিজ্যিক যানবাহনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান
ডিজেলের দাম বাড়ার আরেকটি অপ্রত্যাশিত সুবিধাভোগী হচ্ছে বাণিজ্যিক যানবাহনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা সেবা।
বহরের জ্বালানি কার্ড সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েক্সের প্রধান নির্বাহী মেলিসা স্মিথ জানিয়েছেন, বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি তাদের ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে।
ট্রাক, নির্মাণযন্ত্র ও অন্যান্য বাণিজ্যিক যানবাহনের জ্বালানি ব্যয় যত বাড়ছে, এসব যানবাহনের জ্বালানি কেনাকাটা ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
৪. বৈদ্যুতিক ট্রাক ও বিকল্প জ্বালানি
ডিজেলের দাম ৬ ডলারের ওপরে চলে যাওয়ায় পরিবহন কোম্পানিগুলো এখন বিকল্প জ্বালানি নিয়ে নতুন করে হিসাব করছে।
বৈদ্যুতিক ট্রাকের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। টেসলার বৈদ্যুতিক মালবাহী ট্রাকের জন্য নতুন অর্ডার এসেছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও জানিয়েছে, বেশি ডিজেলের দামের কারণে পরিবহন বহরগুলো বিকল্প জ্বালানি নিয়ে আগের চেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
অর্থাৎ, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু বর্তমান পরিবহন ব্যয় বাড়াচ্ছে না; এটি ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
৫. ডিজেল বিক্রয় কর থেকে রাজস্ব পাওয়া স্টেইট সরকার
ডিজেলের দাম বাড়ার আরেকটি পরোক্ষ সুবিধা পাচ্ছে কিছু স্টেইট সরকার। যেসব অঞ্চলে ডিজেল বিক্রির ওপর কর রয়েছে, সেখানে জ্বালানির দাম বাড়লে কর-রাজস্বও বাড়তে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের গড় দাম অ্যামেরিকার মধ্যে সর্বোচ্চ—প্রতি গ্যালন ৮ দশমিক ৪৩ ডলার। সেখানে ডিজেলের ওপর ১৩ শতাংশ স্টেইট কর রয়েছে।
তবে সরকারের বাড়তি রাজস্ব ভোক্তা ও ব্যবসার জন্য বাড়তি ব্যয়ের বিনিময়ে আসছে। ফলে এটিকে সরাসরি অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
ডিজেলের রেকর্ড দাম মোকাবিলায় ডনাল্ড ট্রাম্প ডিজেল রপ্তানি বন্ধের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। কংগ্রেসের কিছু সদস্য আবার জ্বালানি কর স্থগিত করার দাবি তুলেছেন। তবে অ্যামেরিকার জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট সতর্ক করেছেন, ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং এতে পেট্রোল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির দামও বাড়তে পারে।
কারণ ডিজেলের প্রভাব শুধু ট্রাকের জ্বালানি খরচে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি, নির্মাণ ও পণ্য সরবরাহের প্রতিটি ধাপে এর প্রভাব রয়েছে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত খাবার, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে যুক্ত হতে পারে।
তাই রেকর্ড ডিজেলের বাজারে একদিকে যেমন রেলপথ, আন্তঃপরিবহন ও বিকল্প জ্বালানি খাত নতুন ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতির ব্যয়ের চাপ।
