রাশিয়ার ডিজেল আমদানি
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা চাইছেন ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুক
- 0


প্রকাশিত: অক্টোবর ১২ ২০২৬, ১৩:৩৮
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ চুক্তির বিরোধিতা করে সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের সাতজন সেনেটর। তাঁদের অভিযোগ, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত দেশটি থেকে জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করার মার্কিন আইনের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগ সাংঘর্ষিক। রোববার এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ চালানোর অর্থ জোগাতে অ্যামেরিকার অর্থ ব্যবহার হতে দেওয়া উচিত নয়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন চার রিপাবলিকান সেনেটর সুসান কলিন্স, লিসা মারকাউস্কি, থমাস টিলিস ও জন কার্টিস এবং তিন ডেমোক্র্যাট সেনেটর জিন শাহিন, রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও রন ওয়াইডেন। তাঁদের দাবি, রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি বন্ধে ২০২২ সালে কংগ্রেস যে আইন করেছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়ন ঠেকানো। একই সঙ্গে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রশাসন কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ করেনি এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাও জমা দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
রোববার এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে রিপাবলিকান সেনেটর থমাস টিলিস বলেন, ডিজেল চুক্তিটি বেআইনি হতে পারে এবং এটি অ্যামেরিকানদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। আগামী জানুয়ারিতে সেনেট থেকে অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। টিলিসের ভাষায়, প্রেসিডেন্ট আইন অনুসরণ করছেন না—এমন যুক্তির পক্ষে যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।
গত শুক্রবার ট্রাম্প জানান, রাশিয়া বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়েছে। এরপর মস্কোর যুদ্ধের রাজস্ব কমানোর উদ্দেশ্যে আরোপ করা রুশ জ্বালানিসংক্রান্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করে তাঁর প্রশাসন।
কৃষিকাজ, বাড়িঘর গরম রাখা এবং পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বর্তমানে রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি। ফলে জ্বালানির ব্যয় আগামী মাসের কংগ্রেস নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মস্কোর সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম কমাবে—এমন সম্ভাবনা কম।
চুক্তির পক্ষে প্রশাসন
সমালোচনার মুখেও চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। রোববার ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, বিদ্যমান আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করেই সরকার চুক্তিটি কার্যকর করবে। তাঁর দাবি, এই সমঝোতা অ্যামেরিকানদের জন্য ভালো হবে এবং জ্বালানির দাম কমাতে সহায়তা করবে।
বেসেন্ট বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে প্রশাসন তাদের হাতে থাকা সব আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করবে। কংগ্রেসের কোনো সদস্য পুরোনো আইন কিংবা লিন্ডসে গ্রাহামের নামে প্রস্তাবিত আইনের ভিত্তিতে চুক্তিটি নিষিদ্ধ বলে দাবি করলে তা ভুল হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গত মাসে ট্রাম্প ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের একটি বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা আইনে স্বাক্ষর করেন। সাউথ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সেনেটর ও রাশিয়াবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত লিন্ডসে গ্রাহামের স্মরণে আইনটির নামকরণ করা হয়।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। নেব্রাস্কার সাবেক রিপ্রেজেন্টেটিভ ডন বেকন সামাজিক মাধ্যম এক্সে বলেন, পুতিনের যুদ্ধ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা নৈতিকভাবে ভুল, কারণ সেই অর্থ দিয়ে রাশিয়া শহরগুলোতে বোমা হামলা চালাচ্ছে। ট্রাম্পের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্তকে গ্রাহামের উত্তরাধিকারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে সেনেটে রিপাবলিকানদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা জন ব্যারাসো চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সিবিএসের ‘ফেইস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ট্রাম্পের লক্ষ্য মানুষের ব্যয় কমানো। প্রেসিডেন্টকে কঠিন সিদ্ধান্তের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন ব্যারাসো।
ইউক্রেনের সঙ্গে জ্বালানি যুদ্ধবিরতির দাবি
রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি নিয়ে বিরোধের মধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে নতুন এক ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। রোববার সামাজিক মাধ্যমে তিনি দাবি করেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়া একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। তবে চুক্তির বিস্তারিত জানাননি তিনি।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, তিনি এখনো ওই সমঝোতার বিস্তারিত জানার অপেক্ষায় রয়েছেন। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন করে এবং রাশিয়ারও এতে সম্মত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মস্কোর পক্ষ থেকে ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এর আগে রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করতে কিয়েভের ওপর কয়েক দিন ধরে চাপ দিয়ে আসছিল অ্যামেরিকা।
এদিকে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি রোববার জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তির বিরোধিতা করেন। তাঁর দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়, চুক্তিটি ইউক্রেন, কানাডা ও মিত্রদের ইউরোপে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সরাসরি পরিপন্থী।
ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে আসার প্রেক্ষাপটে নভেম্বরের ৩ তারিখের কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকানদের একটি অংশও তাঁর বিভিন্ন পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত থেকে দূরত্ব তৈরি করছে। ইরান সংঘাত থেকে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ—বিভিন্ন বিষয়ে এই দূরত্ব দেখা যাচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি নিয়ে দুই দলের সেনেটরদের যৌথ আপত্তি সেই রাজনৈতিক চাপকে আরও স্পষ্ট করেছে।
