আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন
ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য ৯টি উপায়ে হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ
- 0


প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫ ২০২৬, ১৬:১২
আমেরিকার আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ফেডারেল সরকারের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কর্মকর্তা, ভোটবিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভোটের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করলে নির্বাচন পরিচালনা, ভোট গণনা ও ফলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের। রয়টার্সের এক বিশেষ অনুসন্ধানে ৫০ জনের বেশি নির্বাচন কর্মকর্তা, ভোটবিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন আইনজীবীর সাক্ষাৎকার এবং সরকারি নথি পর্যালোচনা করে এমন নয়টি সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ১৪ অক্টোবর। তবে এসব পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবে ঘটবে, এমন দাবি করেনি সংবাদ সংস্থাটি।
নভেম্বরের ৩ তারিখের নির্বাচনে আমেরিকার কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেইটের পদ নির্ধারিত হবে। নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প ডাকযোগে ভোটের ওপর বিধিনিষেধ এবং ভোটের প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর প্রশাসন কথিত নির্বাচনি জালিয়াতির অভিযোগে বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়েছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নির্বাচন নিয়ে বিরোধের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়তো কোনো একটি পদক্ষেপে ফল বদলে যাওয়া নয়; বরং একের পর এক তদন্ত, আইনি চ্যালেঞ্জ ও ভোট গণনা নিয়ে বিরোধের কারণে ফলের স্বীকৃতি বিলম্বিত হওয়া এবং জনসাধারণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
নির্বাচনে সম্ভাব্য ৯টি হস্তক্ষেপের ঝুঁকি
১. জালিয়াতি ও ভোটিং মেশিন নিয়ে অভিযোগ: ভোটে কারচুপি, অবৈধ ভোট, ব্যালট বদল কিংবা ভোটিং মেশিনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠতে পারে। অতীতেও এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে ভোটিং ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ভোটের ফল ব্যাপকভাবে বদলে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২. ফল পরিবর্তনে নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ: জালিয়াতি কিংবা বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে স্টেইট কর্মকর্তাদের প্রত্যয়িত ফল প্রত্যাখ্যান বা ফল ঘোষণায় বিলম্ব করতে চাপ দেওয়া হতে পারে। ২০২০ সালের নির্বাচনের পর জর্জিয়ার স্টেইট সেক্রেটারি ব্র্যাড র্যাফেন্সপারগারকে নিজের পরাজয় পাল্টানোর মতো ভোট খুঁজে বের করতে বলেছিলেন ট্রাম্প। র্যাফেন্সপারগার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।
৩. ব্যালট ও ভোটিং সরঞ্জাম জব্দ: আদালতের অনুমোদিত পরোয়ানা বা আইনি সমনের মাধ্যমে ফেডারেল কর্মকর্তারা ব্যালট, ভোটিং মেশিন কিংবা নির্বাচনি নথি জব্দ করতে পারেন। এতে ভোট গণনা ব্যাহত হওয়া, ব্যালটের হেফাজতের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া এবং ফলের স্বীকৃতি বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৪. ফেডারেল পর্যবেক্ষকদের ক্ষমতার সীমা নিয়ে বিরোধ: জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এক হাজার ফেডারেল পর্যবেক্ষক পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই সংখ্যা ছিল ৫৯০। তাঁদের কাজ ভোটারদের অধিকার ও নির্বাচনি আইন মেনে চলা নিশ্চিত করা। তবে পর্যবেক্ষকেরা ভোটকেন্দ্রে কতটা হস্তক্ষেপ করতে পারবেন, তা নিয়ে বিভিন্ন স্টেইটে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
৫. ভোটকেন্দ্রের কাছে অভিবাসন অভিযান: ভোটকেন্দ্রের আশপাশে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার—আইসিই—অভিযান হলে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভীতি তৈরি হতে পারে। এতে বিশেষ করে অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ভোটার উপস্থিতি কমার আশঙ্কা করছেন কিছু নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইনবিশেষজ্ঞ। তবে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের বক্তব্য, ভোটকেন্দ্রকে লক্ষ্য করে আইসিই অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেই।
৬. ভোটকেন্দ্রে সেনা মোতায়েন: অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট বিদ্রোহ দমন আইন প্রয়োগের চেষ্টা করলে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। তবে ভোটকেন্দ্রে সেনা মোতায়েন, নির্বাচনি কাজে হস্তক্ষেপ কিংবা ভোটারদের ভয় দেখানোর বিরুদ্ধে ফেডারেল আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকেও ভোটকেন্দ্রে সেনা পাঠানো বা নির্বাচনি সরঞ্জাম জব্দের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানানো হয়েছে।
৭. জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা: কথিত জালিয়াতি বা বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ঘোষণা প্রেসিডেন্টকে স্টেইটগুলোর নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতা দেবে না। তবে এ নিয়ে বিরোধ হলে মামলা, বিভ্রান্তি ও ফলের স্বীকৃতিতে বিলম্ব হতে পারে।
৮. নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা: ভোটার তালিকা থেকে নাগরিক নয় এমন ভোটারদের বাদ দেওয়া কিংবা নির্বাচনি আইন পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। প্রশাসন বলছে, ভোটার তালিকা সঠিক রাখা কর্মকর্তাদের আইনি দায়িত্ব। অন্যদিকে, কয়েকজন কর্মকর্তা এসব সতর্কতাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তদন্ত, নথি জমা ও আইনি জবাব তৈরিতে সময় ব্যয় হলে নির্বাচনি দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
৯. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কংগ্রেসে দায়িত্ব গ্রহণে বাধা: হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়া আসনে ফল নিয়ে আইনি বিরোধ তৈরি হলে নির্বাচিত প্রার্থীদের দায়িত্ব গ্রহণ বিলম্বিত হতে পারে। নির্বাচনি আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, স্টেইট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন পাওয়া বিজয়ীদের আসন গ্রহণ সরাসরি আটকে দেওয়া কঠিন। তবে বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরুর সময় কিছু আসন খালি থাকতে পারে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাংবিধানিক ক্ষমতা ও নির্বাচনি সুরক্ষা
উদ্বেগের মধ্যেও নির্বাচন কর্মকর্তারা মনে করছেন, আমেরিকার সংবিধান ও আদালতের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ সীমা তৈরি করে। নির্বাচন পরিচালনায় স্টেইটগুলোর বিস্তৃত কর্তৃত্ব রয়েছে। ডাকযোগে ভোট সীমিত করা এবং গোপন ভোটার তালিকার তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকটি উদ্যোগও আদালতে বাধার মুখে পড়েছে।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, প্রশাসনের লক্ষ্য নির্বাচনের সততা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মুখপাত্র লরেন বিস দাবি করেছেন, ‘সেভ আমেরিকা’ আইনের বিরোধিতার মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করছেন। প্রস্তাবিত আইনটিতে ভোটার নিবন্ধনের সময় নাগরিকত্বের প্রমাণ এবং ভোট দেওয়ার সময় ছবিযুক্ত পরিচয়পত্রের শর্ত রাখার কথা রয়েছে। তবে আইনটি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে আটকে আছে।
নির্বাচনি নিরাপত্তায় ব্যালটের রেকর্ড সংরক্ষণ, ভোটিং মেশিন পরীক্ষা এবং কাগুজে ভোটের নথি রাখার মতো ব্যবস্থাও রয়েছে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকায় দেওয়া প্রায় ৯৮ শতাংশ ভোটের কাগজে কোনো না কোনো রেকর্ড তৈরি হয়, যা ইলেকট্রনিক গণনার ফল যাচাইয়ে ব্যবহার করা যায়।
রয়টার্সের অনুসন্ধানের মূল উদ্বেগ তাই শুধু ভোটের ফল বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা নয়। বরং নির্বাচনের আগে ও পরে ধারাবাহিক তদন্ত, আইনি লড়াই এবং ফল নিয়ে বিরোধ এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যাতে ভোটের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসনগুলো দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় আটকে যায়।
