ইসরায়েল নির্বাচন
ক্ষমতার লড়াইয়ে নির্ধারক হতে পারে আরব দলগুলো
- 0


প্রকাশিত: অক্টোবর ২৮ ২০২৬, ১৪:০৫
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট গণনায় এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরও এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে নেই। ফলে নির্বাচনের পর দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে ছোট দলগুলোর সমর্থন, আরব দলগুলোর অবস্থান এবং দীর্ঘ জোট-আলোচনার মধ্য দিয়ে।
২৮ অক্টোবর বুধবার স্থানীয় সময় বিকেল পৌনে চারটা পর্যন্ত ৮৪.৫ শতাংশ ব্যালট গণনার পর প্রকাশিত আংশিক ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসনে এবং আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮টি আসনে ছিল। আরব দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসনের সমর্থন। ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন। অর্থাৎ, গণনায় এগিয়ে থেকেও নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা থেকে আট আসন দূরে। তবে এটি আংশিক ফল; বাকি ভোট গণনা ও আসন বণ্টনের পর হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।
ভোটের ফল আর সরকার গঠন এক বিষয় নয়
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; তাঁরা ভোট দেন বিভিন্ন দলের জাতীয় তালিকায়। দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নেসেটের ১২০টি আসন বণ্টন করা হয়। তবে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব পেতে একটি দলকে জাতীয় ভোটের অন্তত ৩.২৫ শতাংশ অর্জন করতে হয়। এই সীমা অতিক্রম করতে না পারা দল আসন পায় না। ফলে কোনো দলের ভোটের হার সামান্য কমে যাওয়া বা সীমা অতিক্রম করতে না পারার প্রভাব শুধু ওই দলের ওপর নয়, সামগ্রিক আসন বণ্টনেও পড়তে পারে।
এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দল বা জোটের সরকার গঠন নিশ্চিত হয় না। মূল প্রশ্ন হলো—কোন প্রার্থী পার্লামেন্টের অন্তত ৬১ সদস্যের সমর্থন একত্র করতে পারবেন। ছোট দলগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের কয়েকটি আসনই সরকার গঠনের পাল্লা একদিকে ঝুঁকিয়ে দিতে পারে। এ কারণেই ভোট গণনার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য সমঝোতা, পারস্পরিক শর্ত এবং জোটের সীমাবদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রেসিডেন্টের ভূমিকা কী?
আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের পর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। কারা কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়, তা শোনার পর তিনি সেই আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যাঁর সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করেন।
ইসরায়েলের সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মনোনীত প্রার্থী সাধারণত ২৮ দিন সময় পান। প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্ট আরও সর্বোচ্চ ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারেন। অর্থাৎ, সরকার গঠনের জন্য মোট সময় হতে পারে ৪২ দিন। নির্ধারিত সময়ে সরকার গঠন ব্যর্থ হলে অন্য প্রার্থীকে সুযোগ দেওয়ার পথও রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোনো সরকার গঠন সম্ভব না হলে নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তত দিন বিদায়ী সরকার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
আরব দলগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আংশিক ফলের হিসাবে আরব দলগুলো ১৯টি আসনে থাকায় তাদের অবস্থান সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে আসনসংখ্যা থাকলেই যে কোনো দল বা জোটের সঙ্গে তাদের সমঝোতা হবে, এমন নয়। রাজনৈতিক অবস্থান, পারস্পরিক আস্থা, সরকারে অংশগ্রহণের শর্ত এবং নীতিগত বিরোধ—সবকিছুই আলোচনার ফল নির্ধারণ করবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: কোনো সরকারকে সরাসরি অংশীদার হয়ে সমর্থন করা, বাইরে থেকে আস্থা ভোটে সমর্থন দেওয়া এবং কোনো ভোটে বিরত থাকা—এই তিনটি রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। আইজেনকোটের শিবির যদি আরব দলগুলোর সমর্থন চায়, তবে সেই সমর্থন কী শর্তে আসবে, তা সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর শিবিরকে ছোট দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হবে।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান আংশিক ফল থেকে অন্তত তিনটি সম্ভাব্য পথ সামনে আসে। প্রথমত, নেতানিয়াহু ছোট দলগুলোর সমর্থন নিয়ে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন শিবির আরব দলসহ অন্য রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারে। তৃতীয়ত, দুই শিবিরের কেউই প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে না পারলে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে, যার পরিণতিতে নতুন নির্বাচনও সামনে আসতে পারে।
তবে এগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতি, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। আংশিক ভোটের ফল, দলগুলোর চূড়ান্ত আসনসংখ্যা এবং জোট-আলোচনার প্রকৃত অবস্থান পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত কোনো একটি পথকে নিশ্চিত বলা যাবে না।
নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঘাটতি এবং আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা সরকার গঠনের হিসাবকে জটিল করে রেখেছে। শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে দলগুলোর সমঝোতা, পারস্পরিক শর্ত এবং প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর।
