‘মেশিনের স্বর্গ’ তৈরি করছে এআই, ফ্রান্সে পোপ লিওর সতর্কবার্তা
- 0


প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫ ২০২৬, ১৩:২৮ হালনাগাদ: সেপ্টেম্বর ২৫ ২০২৬, ১৫:৩৮
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বিকাশ মানবজীবনকে এমন এক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে ‘মেশিনের স্বর্গ’ পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন পোপ লিও। ফ্রান্সে চার দিনের সফর শুরুর দিনে প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে দেওয়া বক্তব্যে প্রযুক্তির বিকাশকে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানান তিনি।
প্রথম মার্কিন পোপ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এআই-এর ঝুঁকি নিয়ে সরব পোপ লিও। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ফ্রান্স সফরের শুরুতেই সেই বার্তাকে সামনে আনলেন তিনি।
এলিসি প্রাসাদের জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে পোপ লিও বলেন, প্রতিদিনের জীবন যেন এমন এক ‘মেশিনের স্বর্গ’-এর মধ্যে হারিয়ে না যায়, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে নৈতিক বিচক্ষণতা তৈরিতে শিক্ষার ওপর জরুরি ভিত্তিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তবে পোপের ফ্রান্স সফরের আলোচনায় শুধু এআই-ই নয়, জীবনের শেষ পর্যায়ে মানুষের সিদ্ধান্তের অধিকার নিয়েও রয়েছে বড় বিতর্ক। দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তায় মৃত্যুর সুযোগ বা অ্যাসিস্ট ডায়িং বৈধ করার উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন তিনি। দুই মাস আগে ফরাসি রাজনীতিকরা এ ধরনের একটি পদক্ষেপ অনুমোদন করার পর পোপের এই অবস্থান সামনে এলো।
পোপ লিও বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেন মুনাফাকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে পরিণত না হয়। জেনেটিক ম্যানিপুলেশন, সারোগেসি, মানব অঙ্গের বাণিজ্য এবং নিজের মৃত্যুর সময় নির্ধারণের সুযোগ—এসব প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি।
চার দিনের সফরে পোপ লিও ফ্রান্সের তিনটি শহর সফর করবেন। প্যারিস ছাড়াও তাঁর গন্তব্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিখ্যাত ক্যাথলিক তীর্থস্থান লুর্দ এবং জার্মান সীমান্তের কাছে মেত্জ। প্রায় ২০ বছর পর কোনো পোপের প্রথম ফ্রান্স সফর এটি।
প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও তাঁর স্ত্রী ব্রিজিত। শিশুদের একটি দল গান গেয়ে পোপকে স্বাগত জানায় এবং তাঁর অটোগ্রাফও নেয়।
সফরের প্রথম দিনেই নটর-ডাম ক্যাথেড্রালে প্রার্থনা করার কথা রয়েছে পোপ লিওর। ২০১৯ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক এই ক্যাথেড্রাল পুনর্নির্মাণের পর এটিই কোনো পোপের প্রথম সফর।
প্যারিসে যাওয়ার বিমানে সাংবাদিকদের পোপ বলেন, তিনি ফ্রান্সে শান্তির বার্তা নিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান সময়ে এই বার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বক্তব্য। অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে ইউনেস্কো থেকে অ্যামেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর সংস্থাটি অর্থসংকটের মুখে রয়েছে।
হোয়াইট হাউস থেকে সিএনএন-সহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে বাদ দেওয়ার ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ নিয়েও বিমানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন পোপ লিও। জবাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, তাঁর ফ্রান্স সফর কাভার করতে সব সাংবাদিকই স্বাগত।
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রান্সে চার্চ ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ ১৯০৫ সালের আইনে নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে ক্যাথলিক ধর্মের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফরাসি সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা ইনসি-এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ফরাসিদের মধ্যে ক্যাথলিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের হার এখন ২৫ শতাংশ; এক দশক আগে যা ছিল ৪৩ শতাংশ।
ফ্রান্সের সঙ্গে ক্যাথলিক চার্চের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গর্ভপাত ও মৃত্যতে সহায়তার বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য। ২০২৪ সালে ফ্রান্সের সংবিধানে গর্ভপাতের অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাসিস্ট ডায়িং বৈধ করার আইন নিয়েও চার্চের সঙ্গে সরকারের মতবিরোধ রয়েছে।
এর পাশাপাশি পোপ লিওর সফরে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে চার্চের যৌন নির্যাতন কেলেঙ্কারি। ২০২১ সালের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সাত দশকে ফ্রান্সে ক্যাথলিক ধর্মযাজক ও চার্চের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের হাতে প্রায় ৩৩০,০০০ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
এর পর ফরাসি বিশপরা ক্ষতিপূরণ ও শিশু সুরক্ষায় বিভিন্ন ব্যবস্থা নিলেও, ভুক্তভোগীরা এখনও চার্চের কাছ থেকে আরও জবাবদিহিতা দাবি করে আসছেন।
রয়টার্সকে ভুক্তভোগীদের সংগঠনের মুখপাত্র অ্যালাঁ এসকেরে বলেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে’—এই বার্তা ঘোষণার বিশাল দায়িত্ব এখন পোপ লিওর ওপর।
লুর্দে রোববার ক্যাথলিক চার্চের যৌন নির্যাতনের শিকার সাতজন ফরাসি নাগরিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন পোপ লিও। একই সঙ্গে সোমবার ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
অর্থাৎ, এআই-এর দ্রুত বিস্তার থেকে মানবজীবনের নৈতিক সীমা, ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রান্সে চার্চের অবস্থান থেকে অতীতের নির্যাতনের দায়—পোপ লিওর এই সফর শুধু ধর্মীয় সফর নয়। প্রযুক্তি ও সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর সতর্কবার্তার পাশাপাশি চার্চের নিজস্ব সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও এবার ফ্রান্স সফরে বড় পরীক্ষার মুখে পড়ছে।
