মধ্যবর্তী নির্বাচন
আমেরিকায় প্রথম মুসলিম সেনেটর এল-সায়েদ, হাউসে জয় আরও ৭ মুসলিম সদস্যের
- 0


প্রকাশিত: নভেম্বর ৪ ২০২৬, ১৮:৪৪
অ্যামেরিকার কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান থেকে আবদুল এল-সায়েদ সেনেটের আসনে জয়ী হয়েছেন। যার মধ্য দিয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে তিনি জায়গা করে নিচ্ছেন সেনেটে। হাউযে মুসলিম কংগ্রেস সদস্যের সংখ্যা হচ্ছে সাতজন। প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, সেনেটে এল-সায়েদের পাশাপাশি হাউযে নতুন মুখ হিসেবে আসছেন নিউ জার্সির অ্যাডাম হামাউই এবং নিউ ইয়র্কের দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার। আরও চারজন বর্তমান মুসলিম হাউয সদস্য পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। সব মিলিয়ে কংগ্রেসের দুই কক্ষে মুসলিম বিজয়ীর সংখ্যা এখন অন্তত আট।
কিন্তু প্রশ্ন—এই আটটি জয় কি কেবল কয়েকজন প্রার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্য, নাকি অ্যামেরিকার রাজনীতিতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ার বৃহত্তর ইঙ্গিত? কারা জিতলেন, কী প্রেক্ষাপটে তাঁদের জয় এলো এবং কংগ্রেসে তাঁদের উপস্থিতি কী পরিবর্তন আনতে পারে—সেই উত্তর খুঁজতেই এবারের ফলাফলের দিকে তাকাতে হবে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ জয়টি মিশিগানের। ডেমোক্র্যাটিক আবদুল এল-সায়েদ রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে হারিয়ে অবসর নেওয়া সেনেটর গ্যারি পিটার্সের আসন ধরে রেখেছেন। ৪২ বছর বয়সী এল-সায়েদ চিকিৎসক এবং মিশিগানের সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। নির্বাচনী প্রচারে তিনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সবার জন্য চিকিৎসাসেবা এবং রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানোর কথা বলেছেন। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে ছিল সবার জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেয়ার ফর অল। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস—দুই সংবাদমাধ্যমই তাঁকে সেনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে তাঁর প্রচার শুধু অর্থনীতি বা স্বাস্থ্যসেবায় সীমাবদ্ধ ছিল না। গাযায় ইযরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা এবং ইযরায়েলকে অ্যামেরিকার সামরিক সহায়তার বিরোধিতা তাঁকে জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। প্রচারের সময় রিপাবলিকানদের একাংশ তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ও কথিত মুসলিম ব্রাদারহুড-সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এল-সায়েদ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন; রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর পক্ষে সমর্থনযোগ্য প্রমাণ নেই। ডেমোক্র্যাটরা এসব আক্রমণকে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা বলে সমালোচনা করে। মিশিগানের এই জয় তাই ধর্মীয় পরিচয়, পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যেও ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার ঘটনা।
হাউযে নতুন দুই সদস্যের একজন নিউ জার্সির অ্যাডাম হামাউই। ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান গ্রেগ মেলেকে হারিয়ে তিনি নিউ জার্সি থেকে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য হতে যাচ্ছেন। প্লাস্টিক সার্জন হামাউই সাবেক সেনা চিকিৎসক ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। ২০২৪ সালে গাযার ইউরোপিয়ান হাসপাতালে মানবিক চিকিৎসা মিশনেও অংশ নেন তিনি। তাঁর প্রচারে স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার, চিকিৎসা ও শিক্ষাঋণ কমানো এবং সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। নিউ জার্সির স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রাথমিক নির্বাচনী ফলাফলে তাঁর জয় নিশ্চিত হয়েছে।
নিউ ইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার। নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা এই সংগঠক জুনের দলীয় প্রাইমারিতে দীর্ঘদিনের কংগ্রেস সদস্য আদ্রিয়ানো এসপাইয়াতকে হারিয়ে আলোচনায় আসেন। সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীকে পরাজিত করে আসনটি জিতেছেন তিনি। তাঁর প্রচারে কমিউনিটি সংগঠন, নাগরিক অধিকার ও প্যালেস্টিনিয়ান অধিকারের পক্ষে অবস্থান গুরুত্ব পেয়েছে।
আসন ধরে রাখা পাঁচ মুসলিম সদস্যরা হলেন—মিশিগান থেকে রাশিদা তালিব, মিনেসোটা থেকে ইলহান ওমর, ইন্ডিয়ানা থেকে আন্দ্রে কারসন, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে লতিফা সাইমন এবং একই স্টেইটের ১৪তম ডিস্ট্রিক্টে আয়েশা ওয়াহাব। তালিব ও ওমর পঞ্চম মেয়াদে যাচ্ছেন। কারসন ২০০৮ সাল থেকে হাউযে দায়িত্ব পালন করছেন; আর সাইমন ২০২৪ সালে প্রথম নির্বাচিত হওয়ার পর এবারও আসন ধরে রেখেছেন। ওয়াহাব আগস্টের বিশেষ নির্বাচনে কংগ্রেসে প্রবেশের পর এবার পূর্ণ দুই বছরের মেয়াদের জন্য জয়ী হয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম ডিস্ট্রিক্টে ৩৫১টির সব প্রিসিংক্টে ফল প্রকাশের পর তিনি ৫৭ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। তাঁদের জয়ের মধ্য দিয়ে এটা প্রতিয়মান যে, মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বড় শহর বা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়।
এই আটজনের সবাই ডেমোক্র্যাট। তবে তাঁদের একক রাজনৈতিক ব্লক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয়, নাগরিক অধিকার, অভিবাসন, ফিলিস্তিন এবং অ্যামেরিকার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তাঁদের অগ্রাধিকার ও অবস্থানে মিল-অমিল থাকতে পারে। কংগ্রেসে তাঁদের উপস্থিতি এসব বিষয়ে মুসলিম ও সংশ্লিষ্ট কমিউনিটির অভিজ্ঞতা আরও দৃশ্যমান করতে পারে; কিন্তু শুধু পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান এক হবে—এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি নেই।
এই নির্বাচনী চিত্রের আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস—সিএআইআর এবং কেয়ার অ্যাকশনের তথ্য থেকে। সংগঠন দুটি ২০২৬ সালের নির্বাচনী চক্রে স্থানীয়, স্টেইট ও ফেডারেল পর্যায় মিলিয়ে ১৬০ জনের বেশি মুসলিম প্রার্থীকে পর্যবেক্ষণ করেছে। এই হিসাব পুরো নির্বাচনী চক্রের; ৩ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের ব্যালটে থাকা প্রার্থীর নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়। দেশজুড়ে সব পর্যায়ে মুসলিম প্রার্থীদের মোট বিজয়ীর পূর্ণাঙ্গ হিসাবও এখনো নিশ্চিত হয়নি।
অতএব, এবারের নির্বাচনের তাৎপর্য শুধু আটজন মুসলিম প্রতিনিধির সংখ্যায় নয়। প্রথমবারের মতো একজন মুসলিমের সেনেটে প্রবেশ, প্রতিনিধি পরিষদে নতুন দুই সদস্যের আগমন এবং পাঁচজনের আসন ধরে রাখা—সব মিলিয়ে অ্যামেরিকার জাতীয় রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের পরিসর বাড়ল। তবে এই প্রতিনিধিত্ব কতটা নীতিগত প্রভাব তৈরি করবে, তা নির্ভর করবে তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, কংগ্রেসে জোট গঠন এবং ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণের ওপর। পরিচয়ের ইতিহাস তৈরি হয়েছে; এখন পরীক্ষা হবে দায়িত্ব পালনে।
