ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি ঝুঁকিতে: আইএমএফ'র সতর্ক বার্তা

টিবিএন ডেস্ক
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪ ২০২৬, ১৭:০৮ হালনাগাদ: এপ্রিল ১৪ ২০২৬, ১৭:০৮
- 0
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আইএমএফ তাদের সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীল গতিপথ হঠাৎ থামিয়ে দিয়েছে।
সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়ের-অলিভিয়ে গৌরিনশাস বলেন,
“মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেছে।” আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াতে পারে ৩.১ শতাংশে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির আশা ছিল, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, একই সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ৮০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির এই চাপ শুধু পরিবহন বা শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে কৃষি উৎপাদনেও, কারণ সারের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করে বলছে, জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করবে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিল্পখাতে খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ হিসেবে ফিরে আসবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে মন্থরতা দেখা দিতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, যা আবার বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আইএমএফ তাদের বিশ্লেষণে আরও বলেছে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটি এটিকে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, বর্তমান অস্থিরতা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই পূর্বাভাস বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোভিড মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো বড় সংকট মোকাবিলা করেও বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি স্থিতিশীল গতিতে ফিরছিল। কিন্তু ইরানকে ঘিরে এই নতুন সংঘাত সেই পুনরুদ্ধারের ধারাকে আবারও বাধাগ্রস্ত করেছে এবং নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এই সংকটের প্রভাব দেশভেদে ভিন্ন হলেও সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে নিম্ন আয়ের ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর ওপর। জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নড়বড়ে হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং রপ্তানি বিঘ্নের কারণে বড় ধরনের চাপে পড়ছে।
অ্যামেরিকার মতো উন্নত অর্থনীতিগুলো তুলনামূলকভাবে এই ধাক্কা সামাল দিতে পারলেও, সেখানে ভোক্তারা উচ্চ জ্বালানি দামের চাপ অনুভব করছে। অপরদিকে, উচ্চ তেলের দামের কারণে রাশিয়ার মতো জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ কিছুটা অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন আর শুধু একটি আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সংকটে রূপ নিয়েছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আশঙ্কা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আইএমএফের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই সংঘাত দ্রুত সমাধান না হলে বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
