ভালো চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন ৩০ বাংলাদেশি কিন্তু দেশটিতে পৌঁছাতেই মানবপাচারকারীরা কেড়ে নেন মুঠোফোন ও পাসপোর্ট। তারপর জোরপূর্বক চালান করেন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে।
ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হয়ে যুদ্ধের মাঠেই প্রাণ হারান ২০ বাংলাদেশি। গুরুতর আহত হন চারজন। বাকি ছয়জন এখনও আটকে আছেন যুদ্ধক্ষেত্রে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ান-এসআরবি আজ বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছে এসব তথ্য।
এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তিনটি ভাগে (প্রথম ভাগ, মধ্যভাগ ও শেষভাগ) তাদের মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ জন মারা যান। দুজন জখম অবস্থায় ক্যাম্পে ফেরত যান এবং বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
আরও দুজন রাশিয়ার মস্কোতে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন। অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা বাকি ছয়জনের সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা যায়নি।
এ ঘটনায় ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মানব পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি ও কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী যুক্ত ছিলেন। তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান চলছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
টোপ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে চালান
এসআরবি'র প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের একধরনের টোপ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। তাদের ওপর ড্রোন হামলা হলে, এর মাধ্যমে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করা যেত।
মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘যাদের বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হয়েছে, আসলে তারা কেউ যুদ্ধের যোগ্য নয়। যুদ্ধের জন্য তাদের শারীরিক, প্রশিক্ষণ বা কৌশল—কোনো ধরনেরই অনুশীলন ছিল না। তাহলে মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণে তাদের কেন পাঠানো হলো? আমরা যেটা বুঝতে পেরেছি, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য একধরনের টোপ হিসেবে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। যখন প্রতিপক্ষ তাদের ওপর ড্রোন হামলা করে, তখন ওই দেশটি শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করে।’
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, রাশিয়ার যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের লোকজন একইভাবে টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে, বিশেষ করে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গাজীপুর থেকে অনেকে এ নির্মমতার শিকার হয়েছেন বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন তাদের পরিবারের অনেকে স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও মরদেহ দেখার বা দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাচ্ছেন না। বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেন ও যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাইয়ের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে এসআরবি।